ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। রুমিন ফারহানার মতো পরিচিত মুখ থেকে শুরু করে একাধিক হেভিওয়েট নেতাকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রথমে অনেককেই বিস্মিত করেছিল। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছিল—এটা কি বিএনপির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, নাকি সুচিন্তিত কৌশল?
একটি শক্তিশালী ধারণা ছিল, দলের প্রভাবশালী নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হবেন, এরপর আবার মূল দলে ফিরে আসবেন। এতে করে মিত্রদের সামনে ‘চেষ্টা করেছি’—এই বার্তাটিও দেওয়া যাবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, এই হিসাব বাস্তবে উল্টো ফল দিচ্ছে। যাদের কৌশলগত সম্পদ ভাবা হয়েছিল, তারাই এখন দলের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
বর্তমানে সারাদেশে অন্তত ৭৮টি আসনে বিএনপির সাবেক ও বহিষ্কৃত নেতারা স্বতন্ত্র পরিচয়ে মাঠে সক্রিয়। এই প্রবণতা শুধু দলীয় শৃঙ্খলার সংকটই তৈরি করেনি, বরং ভোটের অঙ্কে জন্ম দিয়েছে এক নতুন ও জটিল সমীকরণের। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই বিভাজনের সুযোগে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে? অধিকাংশ বিশ্লেষকের উত্তর একটাই: জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত যেন এই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিল। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে তারা কার্যত কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করেছে। ধানের শীষের ভোট যখন মূল প্রার্থী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই ফাঁক গলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গীরা।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিলেও শরিকদের জন্য ছেড়েছে মাত্র আটটি আসন। এত অল্প আসন নিয়েও জোটের ভেতরে অসন্তোষ থামেনি। বরং অভিযোগ উঠেছে—তৃণমূলের পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে প্রবাসী কিংবা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। এর ফলেই বহু জায়গায় বিদ্রোহ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
প্রার্থী প্রত্যাহারের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এখন ব্যালট পেপারে প্রায় ৯৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর নাম থাকছে। অর্থাৎ ভোটারদের সামনে একই রাজনৈতিক ধারা থেকে আসা একাধিক বিকল্প হাজির থাকবে। এই দ্বিধাই জামায়াতের জন্য হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
বিশেষ করে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে এই বাস্তবতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে এই দুই অঞ্চলে জামায়াতের অবস্থান দুর্বল হলেও এবার চিত্র বদলাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিভাগের অন্তত ৩৫টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট কেটে নিতে পারেন, যা জামায়াত প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট।
পশ্চিমাঞ্চলে—রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে—জামায়াতের প্রভাব বরাবরই তুলনামূলক শক্ত। কিন্তু বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব সেই শক্তিকে আরও পোক্ত করছে। একাধিক আসনে ধানের শীষের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় জামায়াতের জন্য জয়ের রাস্তা অনেকটাই মসৃণ হয়ে গেছে বলে গণমাধ্যমে উঠে আসছে।
ময়মনসিংহ, শেরপুর কিংবা ঢাকার নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনে দৃশ্যমান হচ্ছে একই চিত্র—বিএনপির মূল প্রার্থীকে লড়তে হচ্ছে একদিকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে, অন্যদিকে নিজের দলের সাবেক সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। এই ‘ছায়া যুদ্ধ’ বিএনপির নির্বাচনী শক্তিকে দুর্বল করছে, আর জামায়াত সেই দুর্বলতাকে সংগঠিত শক্তিতে রূপ দিচ্ছে।
জোটের ছোট শরিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও বিদ্রোহীরা হয়ে উঠছেন অপ্রত্যাশিত সহায়ক। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো আসনগুলোতে বিএনপির ভাঙনের সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। ভোটারদের দ্বিধা, আবেগ ও ব্যক্তিগত আনুগত্য এখানে দলীয় সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে জামায়াত নিজেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেখছে। আর সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন না দেওয়া কি ছিল সুপরিকল্পিত কৌশল, নাকি রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেবে ব্যালট বাক্স ও ইতিহাস। তবে এটুকু নিশ্চিত, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তার ফলাফল বিএনপির জন্য সুখকর নাও হতে পারে।