চলুন, শুরু করা যাক একটি প্রশ্ন দিয়ে।
১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস। দেশের সেনাপ্রধানকে তাঁর নিজের বাড়িতেই গৃহবন্দি করা হলো। যিনি এই বন্দি করার কাজটি করেছিলেন, সেই খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান বলে ঘোষণা দিলেন। সময়টা মোটে চার দিন।
এর ঠিক চার দিন পর, ৭ই নভেম্বরের ভোরে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের সৈনিকরা সেই বন্দি জেনারেলকে মুক্ত করলেন। সেদিন বন্দিদশা থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন, তিনি আর কেউ নন—জিয়াউর রহমান। এই মুক্তিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে পৌঁছে দেয়। তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহু মানুষের চোখে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত হন।
একটি মুক্তি, ইতিহাসের এক বিশাল বাঁকবদলের মুহূর্ত। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—ওই চার দিনে আদতে কী ঘটেছিল? ব্যারাকে থেকে সেদিন ঠিক কে বেরিয়ে এসেছিল এবং কেন? জিয়া কি কেবল এই ঘটনার একজন সুবিধাভোগী ছিলেন, নাকি এর কেন্দ্রবিন্দুতে তিনিই ছিলেন? আর এই মুক্তির জন্য যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের মধ্যে কাউকে কেন পরে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো?
আজকের ব্লগে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; বরং আমরা দেখব ৭ই নভেম্বর আসলে কী ছিল, কে কী চেয়েছিল, কে কী পেল এবং কেন এই দিনটি আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
বারুদের ওপর চার ফায়ার: নভেম্বরের পটভূমি
৭ই নভেম্বর কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। এটি ছিল বারুদের স্তূপে পড়া চতুর্থ স্ফুলিঙ্গ।
প্রথম স্ফুলিঙ্গ: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ।
দ্বিতীয় স্ফুলিঙ্গ: ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনী এবং ফেব্রুয়ারিতে বাকশাল গঠন, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে দেয়।
তৃতীয় স্ফুলিঙ্গ: সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এবং পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অফিসারদের মধ্যকার পদোন্নতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
চতুর্থ স্ফুলিঙ্গ: ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন, যেখানে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খোন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হলেও আসল ক্ষমতা চলে যায় মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের হাতে। সামরিক বিজ্ঞানে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক—যেখানে চেইন অব কমান্ড ও ক্ষমতার চেয়ার এক থাকে না।
খালেদের পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ইতিহাসের বড় ভুল
নভেম্বর ব্রিগেডের খালেদ মোশাররফ একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। তাঁর উদ্দেশ্য পরিষ্কার ছিল—১৫ই আগস্টের অফিসারদের প্রভাব ভেঙে সেনাবাহিনীকে আবার শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।
কিন্তু খালেদ একটি মারাত্মক ভুল করলেন। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্র ঠিকই দখল করলেন, কিন্তু সেই ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে পারলেন না। সামরিক ইতিহাসে ভবন দখল করা সহজ, কিন্তু সৈনিকদের মনে আপনার আদেশ মানার যৌক্তিকতা তৈরি করতে না পারলে সে ক্ষমতা টেকসই হয় না।
এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেকটি নৃশংস ঘটনা—ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হলো চার জাতীয় নেতাকে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান)। যে অভ্যুত্থানের শুরুতেই এমন রক্তের দাগ লাগে, তার নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়তে বাধ্য। সেনাবাহিনীর ভেতরেও খালেদের পক্ষে কোনো জোরালো ঐকমত্য তৈরি হলো না।
এক গাড়ি, দুই গন্তব্য: কর্নেল তাহের ও জিয়াউর রহমান
এই ক্ষমতার শূন্যতায় প্রবেশ করলেন কর্নেল আবু তাহের—মুক্তিযুদ্ধে এক পা হারানো এক বীর যোদ্ধা, যিনি তখন সেনাবাহিনী ছেড়ে জাসদের গণবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ব্যারাকের ভেতরের বৈষম্য ও শ্রেণিভেদ দূর করে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে এক সুতোয় বাঁধা। এই লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছিল 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'। সাধারণ সৈনিকদের ক্ষোভ ও বৈষম্যের ক্ষোভও তখন তুঙ্গে।
৭ই নভেম্বরের ভোরে যখন সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলো, তখন জিয়া মুক্ত হলেন এবং একই দিনে প্রাণ হারালেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হায়দার ও কর্নেল হুদা। এটি যে রক্তপাতহীন কোনো ঘটনা ছিল না, তা মার্কিন কূটনৈতিক ক্যাবলসহ সেসময়ের বিভিন্ন দলিলেই স্পষ্ট।
এখানেই দেখা দেয় এক অদ্ভুত সমীকরণ। ৭ই নভেম্বরের ভোরে দুটি পক্ষ একই রাস্তায় নেমেছিল বটে, কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল দুই মেরুতে:
জিয়ার লক্ষ্য: নিজের মুক্তি ও সেনাবাহিনীর কমান্ড পুনরায় নিজের হাতে নেওয়া।
তাহেরের লক্ষ্য: মুক্তির পর রাষ্ট্রে ও সমাজে একটি বিপ্লবী রূপান্তর ঘটানো।
একে বলা চলে "এক গাড়ি, দুই গন্তব্য" সিন্ড্রোম। দুই যাত্রী একই গাড়িতে উঠলেও তাদের গন্তব্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
তাহের কেন হেরে গেলেন?
বিদ্রোহের পর জিয়া তাঁর কমান্ড শক্ত করলেন। অন্যদিকে, কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হলো, সামরিক বিচারে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো (যদিও পরবর্তীতে এই বিচার ও এর বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে)।
তাহের কেন হেরে গেলেন? কারণ, একটি বিদ্রোহ এক রাতে ঘটানো যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লাগে। তাহের সৈনিকদের রাস্তায় নামাতে পেরেছিলেন, কিন্তু বিদ্রোহের পরের দিন দেশ চালানোর জন্য তাঁর কোনো প্রশাসন বা বিকল্প কাঠামো ছিল না। অন্যদিকে, জিয়ার পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড—ব্যারাকের সৈনিকরা শেষ পর্যন্ত যে শৃঙ্খলার দিকেই তাকিয়ে থাকে।
সহজ কথায়: তাহের বাঘের পিঠে চড়েছিলেন, কিন্তু বাঘের লাগাম ছিল অন্য কারো হাতে। ঝড় তোলার আনন্দ এক জিনিস, আর ঝড় থামার পর জমি ধরে রাখা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।
একই দিন, তিনটি ভিন্ন বয়ান
আজ ৭ই নভেম্বরকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে:
১. বিএনপি: জিয়ার মুক্তি এবং সিপাহি-জনতার ঐক্যের দিন হিসেবে দেখে।
২. আওয়ামী লীগ: মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও এর নেপথ্য সত্যের ওপর জোর দেয়।
৩. জাসদ: সৈনিকদের ন্যায্য অধিকার ও একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নভঙ্গের দিন হিসেবে দেখে।
বাস্তবতা হলো, এই তিনটি বয়ানই যেন একেকটি জানালা। কিন্তু কোনো একটি একক জানালা দিয়ে পুরো ঘরটিকে সম্পূর্ণ দেখা সম্ভব নয়।
আজকের বাংলাদেশের জন্য ৭ই নভেম্বরের ৫ শিক্ষা
৫০ বছর আগের এই ইতিহাস থেকে আজকের বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে:
১. ক্ষমতার শূন্যতা খালি থাকে না: রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হারিয়ে ক্ষমতা অস্ত্রের মুখে চলে যায়।
২. ব্যারাকের অসন্তোষ অবহেলা নয়: সৈনিকদের ক্ষোভকে রাজনীতির জ্বালানি বানালে তা হিতে বিপরীত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এই ক্ষোভ দূর করতে হবে।
৩. বৈধতা ছাড়া স্থায়িত্ব নেই: জনগণের বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া কোনো পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
৪. সাময়িক জোট মানেই অভিন্ন লক্ষ্য নয়: রাজনীতিতে 'শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু' হলেও জয়ের পরের দিন কে কী চায়, তা পরিষ্কার না থাকলে বিপদ অনিবার্য।
৫. ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যাবে না: আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ইতিহাসের সত্য ঢাকা যায় না। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত আদালত, আর্কাইভ ও গবেষণার মাধ্যমে।
তিনজন মানুষ, তিনটি পরিণতি—কেউ ক্ষমতার শিখরে পৌঁছলেন, কেউ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুললেন, আবার কেউ নিজের অর্জিত জায়গাতেই প্রাণ হারালেন। যে সাধারণ সৈনিকরা রক্ত দিয়ে রাজপথ গরম করেছিল, তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় হয়তো আজ গুরুত্ব পায় না, কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্য কিন্তু তাদেরকেই চুকাতে হয়।
ইতিহাসকে অন্ধভাবে কোনো একপাক্ষিক দলের বয়ানে বিশ্বাস করার নাম ভালোবাসা নয়; বরং সব প্রমাণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকে স্বীকার করার নামই প্রকৃত ইতিহাস চেতনা।
আপনার কাছে ৭ই নভেম্বর কী মনে হয়? এটি কি একটি বিপ্লব, একটি গণ-অভ উত্থান, নাকি একটি অসম্পূর্ণ বিপ্লবের ট্র্যাজেডি? কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে পারেন। তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস জানতে লেখাটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।
আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।






