৭ই নভেম্বর: বিপ্লব, ষড়যন্ত্র নাকি ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়?

চলুন, শুরু করা যাক একটি প্রশ্ন দিয়ে।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস। দেশের সেনাপ্রধানকে তাঁর নিজের বাড়িতেই গৃহবন্দি করা হলো। যিনি এই বন্দি করার কাজটি করেছিলেন, সেই খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান বলে ঘোষণা দিলেন। সময়টা মোটে চার দিন।

এর ঠিক চার দিন পর, ৭ই নভেম্বরের ভোরে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের সৈনিকরা সেই বন্দি জেনারেলকে মুক্ত করলেন। সেদিন বন্দিদশা থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন, তিনি আর কেউ নন—জিয়াউর রহমান। এই মুক্তিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে পৌঁছে দেয়। তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহু মানুষের চোখে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত হন।

একটি মুক্তি, ইতিহাসের এক বিশাল বাঁকবদলের মুহূর্ত। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—ওই চার দিনে আদতে কী ঘটেছিল? ব্যারাকে থেকে সেদিন ঠিক কে বেরিয়ে এসেছিল এবং কেন? জিয়া কি কেবল এই ঘটনার একজন সুবিধাভোগী ছিলেন, নাকি এর কেন্দ্রবিন্দুতে তিনিই ছিলেন? আর এই মুক্তির জন্য যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের মধ্যে কাউকে কেন পরে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হলো?

আজকের ব্লগে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; বরং আমরা দেখব ৭ই নভেম্বর আসলে কী ছিল, কে কী চেয়েছিল, কে কী পেল এবং কেন এই দিনটি আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

বারুদের ওপর চার ফায়ার: নভেম্বরের পটভূমি

৭ই নভেম্বর কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। এটি ছিল বারুদের স্তূপে পড়া চতুর্থ স্ফুলিঙ্গ।

  প্রথম স্ফুলিঙ্গ: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ।

  দ্বিতীয় স্ফুলিঙ্গ: ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনী এবং ফেব্রুয়ারিতে বাকশাল গঠন, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে দেয়।

  তৃতীয় স্ফুলিঙ্গ: সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এবং পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অফিসারদের মধ্যকার পদোন্নতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

  চতুর্থ স্ফুলিঙ্গ: ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন, যেখানে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খোন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হলেও আসল ক্ষমতা চলে যায় মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের হাতে। সামরিক বিজ্ঞানে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক—যেখানে চেইন অব কমান্ড ও ক্ষমতার চেয়ার এক থাকে না।

খালেদের পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ইতিহাসের বড় ভুল

নভেম্বর ব্রিগেডের খালেদ মোশাররফ একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। তাঁর উদ্দেশ্য পরিষ্কার ছিল—১৫ই আগস্টের অফিসারদের প্রভাব ভেঙে সেনাবাহিনীকে আবার শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।

কিন্তু খালেদ একটি মারাত্মক ভুল করলেন। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্র ঠিকই দখল করলেন, কিন্তু সেই ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে পারলেন না। সামরিক ইতিহাসে ভবন দখল করা সহজ, কিন্তু সৈনিকদের মনে আপনার আদেশ মানার যৌক্তিকতা তৈরি করতে না পারলে সে ক্ষমতা টেকসই হয় না।

এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেকটি নৃশংস ঘটনা—ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হলো চার জাতীয় নেতাকে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান)। যে অভ্যুত্থানের শুরুতেই এমন রক্তের দাগ লাগে, তার নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়তে বাধ্য। সেনাবাহিনীর ভেতরেও খালেদের পক্ষে কোনো জোরালো ঐকমত্য তৈরি হলো না।

এক গাড়ি, দুই গন্তব্য: কর্নেল তাহের ও জিয়াউর রহমান

এই ক্ষমতার শূন্যতায় প্রবেশ করলেন কর্নেল আবু তাহের—মুক্তিযুদ্ধে এক পা হারানো এক বীর যোদ্ধা, যিনি তখন সেনাবাহিনী ছেড়ে জাসদের গণবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ব্যারাকের ভেতরের বৈষম্য ও শ্রেণিভেদ দূর করে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে এক সুতোয় বাঁধা। এই লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছিল 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'। সাধারণ সৈনিকদের ক্ষোভ ও বৈষম্যের ক্ষোভও তখন তুঙ্গে।

৭ই নভেম্বরের ভোরে যখন সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলো, তখন জিয়া মুক্ত হলেন এবং একই দিনে প্রাণ হারালেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হায়দার ও কর্নেল হুদা। এটি যে রক্তপাতহীন কোনো ঘটনা ছিল না, তা মার্কিন কূটনৈতিক ক্যাবলসহ সেসময়ের বিভিন্ন দলিলেই স্পষ্ট।

এখানেই দেখা দেয় এক অদ্ভুত সমীকরণ। ৭ই নভেম্বরের ভোরে দুটি পক্ষ একই রাস্তায় নেমেছিল বটে, কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল দুই মেরুতে:

  জিয়ার লক্ষ্য: নিজের মুক্তি ও সেনাবাহিনীর কমান্ড পুনরায় নিজের হাতে নেওয়া।

  তাহেরের লক্ষ্য: মুক্তির পর রাষ্ট্রে ও সমাজে একটি বিপ্লবী রূপান্তর ঘটানো।

একে বলা চলে "এক গাড়ি, দুই গন্তব্য" সিন্ড্রোম। দুই যাত্রী একই গাড়িতে উঠলেও তাদের গন্তব্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তাহের কেন হেরে গেলেন?

বিদ্রোহের পর জিয়া তাঁর কমান্ড শক্ত করলেন। অন্যদিকে, কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হলো, সামরিক বিচারে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো (যদিও পরবর্তীতে এই বিচার ও এর বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে)।

তাহের কেন হেরে গেলেন? কারণ, একটি বিদ্রোহ এক রাতে ঘটানো যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লাগে। তাহের সৈনিকদের রাস্তায় নামাতে পেরেছিলেন, কিন্তু বিদ্রোহের পরের দিন দেশ চালানোর জন্য তাঁর কোনো প্রশাসন বা বিকল্প কাঠামো ছিল না। অন্যদিকে, জিয়ার পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড—ব্যারাকের সৈনিকরা শেষ পর্যন্ত যে শৃঙ্খলার দিকেই তাকিয়ে থাকে।

সহজ কথায়: তাহের বাঘের পিঠে চড়েছিলেন, কিন্তু বাঘের লাগাম ছিল অন্য কারো হাতে। ঝড় তোলার আনন্দ এক জিনিস, আর ঝড় থামার পর জমি ধরে রাখা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।

একই দিন, তিনটি ভিন্ন বয়ান

আজ ৭ই নভেম্বরকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে:

১. বিএনপি: জিয়ার মুক্তি এবং সিপাহি-জনতার ঐক্যের দিন হিসেবে দেখে।

২. আওয়ামী লীগ: মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও এর নেপথ্য সত্যের ওপর জোর দেয়।

৩. জাসদ: সৈনিকদের ন্যায্য অধিকার ও একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নভঙ্গের দিন হিসেবে দেখে।

বাস্তবতা হলো, এই তিনটি বয়ানই যেন একেকটি জানালা। কিন্তু কোনো একটি একক জানালা দিয়ে পুরো ঘরটিকে সম্পূর্ণ দেখা সম্ভব নয়।

আজকের বাংলাদেশের জন্য ৭ই নভেম্বরের ৫ শিক্ষা

৫০ বছর আগের এই ইতিহাস থেকে আজকের বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে:

  ১. ক্ষমতার শূন্যতা খালি থাকে না: রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হারিয়ে ক্ষমতা অস্ত্রের মুখে চলে যায়।

  ২. ব্যারাকের অসন্তোষ অবহেলা নয়: সৈনিকদের ক্ষোভকে রাজনীতির জ্বালানি বানালে তা হিতে বিপরীত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এই ক্ষোভ দূর করতে হবে।

  ৩. বৈধতা ছাড়া স্থায়িত্ব নেই: জনগণের বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া কোনো পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

  ৪. সাময়িক জোট মানেই অভিন্ন লক্ষ্য নয়: রাজনীতিতে 'শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু' হলেও জয়ের পরের দিন কে কী চায়, তা পরিষ্কার না থাকলে বিপদ অনিবার্য।

  ৫. ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যাবে না: আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ইতিহাসের সত্য ঢাকা যায় না। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত আদালত, আর্কাইভ ও গবেষণার মাধ্যমে।


তিনজন মানুষ, তিনটি পরিণতি—কেউ ক্ষমতার শিখরে পৌঁছলেন, কেউ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুললেন, আবার কেউ নিজের অর্জিত জায়গাতেই প্রাণ হারালেন। যে সাধারণ সৈনিকরা রক্ত দিয়ে রাজপথ গরম করেছিল, তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় হয়তো আজ গুরুত্ব পায় না, কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্য কিন্তু তাদেরকেই চুকাতে হয়।

ইতিহাসকে অন্ধভাবে কোনো একপাক্ষিক দলের বয়ানে বিশ্বাস করার নাম ভালোবাসা নয়; বরং সব প্রমাণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকে স্বীকার করার নামই প্রকৃত ইতিহাস চেতনা।

 আপনার কাছে ৭ই নভেম্বর কী মনে হয়? এটি কি একটি বিপ্লব, একটি গণ-অভ উত্থান, নাকি একটি অসম্পূর্ণ বিপ্লবের ট্র্যাজেডি? কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে পারেন। তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস জানতে লেখাটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।



আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

রাজনীতির মাঠে কৌশল বনাম পেশিশক্তি

 


                  কার পরিকল্পনা সফল হলো?

রাজনীতি কেবল ভোটের বাক্স কিংবা বিজয়ের হিসাব-নিকাশ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল, জনমত তৈরি এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার এক সুক্ষ্ম খেলা। সাম্প্রতিক একটি উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এই প্রশ্নটিই জোরালো হয়ে উঠেছে—নির্বাচনে জয় পেলেও বিএনপি কি কৌশলগত লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ল?

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কৌশল এবং বিএনপির রাজনৈতিক পদক্ষেপ এক ভিন্ন বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে। চলুন, বিষয়টি একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

১. জামায়াতের ভিন্ন কৌশল: পেশিশক্তির বদলে মিডিয়া ফোকাস

শুরুতেই একটি প্রশ্ন আসতে পারে—জামায়াত কি জানত না যে বিএনপি তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে নানা অনিয়ম বা কারচুপির আশ্রয় নিতে পারে?

সম্ভবত জামায়াত এটি আগে থেকেই অনুধাবন করতে পেরেছিল। কিন্তু তারা পাল্টা পেশিশশক্তি প্রয়োগের পুরনো পথে হাঁটেননি। তাদের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আধুনিক। আজকের নির্বাচনে জামায়াতের মূল ফোকাস ছিল মিডিয়া এবং জনসচেতনতা।

  • তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা: ভোটকেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি এবং প্রতিটি অনিয়মের চিত্র শুরু থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরায় তারা জোর দেয়।
  • বাস্তব চিত্র তুলে ধরা: কেবল মুখে অভিযোগ না করে, অনিয়মের দৃশ্যগুলো জনসম্মুক্ষে নিয়ে আসা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ নিজে থেকেই পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করতে পারে।

২. অভিযোগের বাস্তব প্রমাণ ও জনগণের কাছে বার্তা

জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াত যেসব অভিযোগ তুলেছিল, এবারের উপনির্বাচনে বিএনপির কিছু কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কি সেই অভিযোগগুলোরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটল? এই প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

রাজনীতিতে শুধু জয়লাভই শেষ কথা নয়; একটি নির্বাচন কতটা প্রশ্নবিদ্ধ হলো, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত চেয়েছে পেশিশক্তি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে অনিয়মের জীবন্ত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে। কারণ, কথার চেয়ে বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের মনে অনেক বেশি গভীর রেখাপাত করে।

৩. ক্ষমতার প্রভাব ও পুরোনো বিতর্কের পুনরাবৃত্তি

ক্ষমতার প্রভাব বা সরকারি দলের প্রভাব যে কোনো নির্বাচনে কতটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে, আজকের ঘটনা যেন সেই পুরোনো বিতর্ককেই আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে।

রাজনীতিতে সব জয়-পরাজয় শুধু ভোটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো কৌশল, জনমত এবং গণমাধ্যমে উঠে আসা বাস্তব চিত্রও বড় কোনো দলের দীর্ঘmeyadi রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।

বলুন তো জয় কার, পরাজয় কার?

দিন শেষে তাই বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—বিএনপি কি কেবল একটি উপনির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাবই কষল? নাকি এই নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনমতের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে তারা বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা খেল?

ভোটের বাক্সের ফলাফল সাময়িক হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া জনমত ও রাজনৈতিক বার্তা সুদূরপ্রসারী। সময়ের পরিক্রমায়ই হয়তো এর প্রকৃত উত্তর মিলে যাবে।

আপনার কী মনে হয়? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পেশিশক্তির রাজনীতি বাদ দিয়ে কি কৌশলগত ও গণমাধ্যমমুখী রাজনীতির সময় এসে গেছে? কমেন্টে আপনার মতামত জানিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হোন।

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন


 অনিয়ম, ভুয়া ভোটার ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ভোটের পরিবেশ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শূন্য হওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। তবে উৎসবমুখর পরিবেশের প্রত্যাশা নিয়ে ভোট শুরু হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে একের পর এক অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসতে শুরু করেছে।

১. ব্যালট পেপারে আগেই সিল ও 'আগে ভোট হয়ে যাওয়ার' অভিযোগ

নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও ভোটার কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পেরেছেন যে তার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।

একটি কেন্দ্রের ভুক্তভোগী ভোটারের কথোপকথন থেকে চিত্রটি স্পষ্ট হয়:

 প্রশ্ন: কেন ঘুরে আসলেন?

 উত্তর: আমার নাইমের ভোট তৈরি হয়ে গেছে।

 প্রশ্ন: মানে ভোট হয়ে গেছে?

সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জেরার মুখে ফাঁকা রুমে ভোটার ছাড়াই ব্যালটে আগে সিল দেওয়ার বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে।

২. নির্বাচন কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র নিয়ে প্রশ্ন

শুধু আগাম সিল মারাই নয়, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টদের পরিচয়পত্র নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

  অনেক কেন্দ্রে প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া অফিশিয়াল পরিচয়পত্রে কোনো ছবি পাওয়া যায়নি।

  বহু কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের গলায় বা কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক কার্ড ছিল না। কেউ কেউ পকেটের ওপর সাদা কাগজে নাম-পরিচয় লিখে সেফটি পিন দিয়ে আটকে রেখেছেন।

  পরিচয়পত্র না থাকার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, তারা কমিশন থেকে কার্ড পাননি।

পরিচয়পত্রহীন এসব ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধে 'প্রক্সি এজেন্ট' হওয়ারও তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

৩. প্রকাশ্য আচরণবিধি লঙ্ঘন ও স্লোগান

ভোটের দিনে প্রকাশ্যেই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে:

  সকালে একটি কেন্দ্রের সামনে একদল নারীকে ধানের শীষের পোস্টার হাতে নিয়ে "সিল মারো ভাই সিল মারো, ধানের শীষে সিল মারো" স্লোগান দিতে দেখা যায়।

  জগন্নাথপুর আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানায় মাইকে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

  আরেকটি কেন্দ্রে পুলিশের সামনেই ধানের শীষের সমর্থকদের প্রচারপত্র ছিঁড়ে উড়িয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়।

৪. ভুয়া ভোটার আটক

সারাদিন চলা এসব অনিয়ম ও উত্তেজনার মধ্যেই দুপুরের দিকে একটি কেন্দ্র থেকে তিনজন সন্দেহভাজন ভুয়া ভোটারকে আটক করার খবর পাওয়া যায়।

প্রার্থীদের অবস্থান ও সার্বিক পরিস্থিতি

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন প্রার্থী। তাদের মধ্যে বিএনপির মির্জা ফয়সাল আমিন এবং জামায়াতের প্রার্থী দলোয়ার হোসেন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দী। সকালে ভোট দিয়ে তারা সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেও, পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া নানা অনিয়মের অভিযোগ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ ও সমকালীন সমাজ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আজ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুরুল হক মিলনায়তনে ‘নারীর অধিকার ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ ও সমকালীন সমাজ’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নারীর অধিকার ফাউন্ডেশনের সভাপতি মমতাজ মাননানের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংগঠনের সহ-সভাপতি প্রফেসর নাঈমা মোয়াজ্জমের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম-সম্পাদক ডা. তাহেরা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধানত নারী সুধীবৃন্দ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সভার সূচনা হয়।

সভায় সমকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতের বিভিন্ন দিক, আধ্যাত্মিকতা এবং নববী আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ৫ জন বিশিষ্ট আলোচক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে সভাপতি প্রফেসর নাঈমা মোয়াজ্জম ‘পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় নবীজী ﷺ-এর আদর্শ’ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে পারিবারিক ভাঙন ও অশান্তি দূর করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনই একমাত্র পথপ্রদর্শক। স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের প্রতি নবীজির ভালোবাসা ও কোমল আচরণ ধারণ করাই সুখী পরিবারের মূল ভিত্তি।

‘নবীজি ﷺ-এর সালাত ও আল্লাহর প্রতি ব্যাকুলতা’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন সংগঠনের সহ-সভাপতি প্রফেসর আফিফা মুশতারী। তিনি বলেন, সালাত কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা ছিল আল্লাহর সাথে নবীজির প্রেমের কথোপকথন ও পরম প্রশান্তির মাধ্যম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতার চর্চা করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তরুণ প্রজন্মের নৈতিক সংকট ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন সংগঠনের যুগ্ম-সম্পাদক প্রফেসর ড. শারমীন ইসলাম। ‘সমকালীন চ্যালেঞ্জ ও তরুণদের পথপ্রদর্শক রাসূল ﷺ’ শীর্ষক বক্তব্যে তিনি বলেন, তরুণ বয়স থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী ও সৎ ছিলেন। তাঁর সততা, নৈতিকতা এবং বন্ধু নির্বাচনে সচেতনতা আজকের তরুণ সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

‘ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ ﷺ’ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে সংগঠনের সহ-সম্পাদক ড. সাজেদা হোমায়রা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে কন্যাসন্তানের জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছেন এবং সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছেন। সমাজে নারীর প্রকৃত সম্মান ফেরাতে সীরাতের চর্চা বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ। ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সিরাতের শিক্ষা’ বিষয়ে তিনি বলেন, মহানবী ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণে বহুজাতি ও বহুধর্মের সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভব। রাজনৈতিক পরিচয় ও মতপার্থক্য ভুলে সমাজে পরম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর ও সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন।

সভার সমাপনী বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুন নাহার বলেন, "আমরা এমন এক যান্ত্রিক যুগে বাস করছি যেখানে বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়লেও ভেতরের আধ্যাত্মিকতা শুকিয়ে যাচ্ছে। মা আয়েশা (রা.) ও মা ফাতিমা (রা.)-দের উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের মা-বোনদের ঘরের ভেতর নবীজির ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।" পাশাপাশি, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শান্তির বাণীগুলো গণমাধ্যমের লেখনীর মাধ্যমে সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

সবশেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে এবং উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

মমতাজ মাননান

সভাপতি

নারীর অধিকার ফাউন্ডেশন

তারিখ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬

জামালগঞ্জ এসিল্যান্ডের রহস্যজনক ফেসবুক পোস্ট ও উত্তাল সুনামগঞ্জ


 

নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি স্ট্যাটাস ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে পুরো সুনামগঞ্জ জুড়ে। জামালগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড মো. আরিফুর রহমান শান্ত তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে নিজের মৃত্যুর জন্য সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পা রানী মোদককে দায়ী করে একটি বিস্ফোরক পোস্ট দেন।

এই আকস্মিক ঘটনা ও এর পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে আজকের এই ব্লগ পোস্ট।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

গত শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদকের মেয়ের জন্মদিনের কেক কাটা অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক আমন্ত্রিত ছিলেন এসিল্যান্ড আরিফুর রহমান।

অনুষ্ঠান শেষ করে ইউএনওর বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই এসিল্যান্ডের অফিশিয়াল ফেসবুক আইডি (এসিল্যান্ড জামালগঞ্জ) থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টে তিনি সরাসরি লেখেন—

"আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবেন।"

পাশাপাশি তিনি ক্যাডার সার্ভিস থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন। এই পোস্ট মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং স্থানীয় মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

ইউএনওর বাসায় যা ঘটেছিল

ইউএনও শিল্পী রানী মোদক গণমাধ্যমকে জানান, তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার পরই এসিল্যান্ড আরিফুর রহমান অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। তাঁর ভাষ্যমতে:

  তিনি এক আনসার সদস্যকে মারধর করেন।

  ইউএনওর তিন বছরের ছোট মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দেন।

  রাস্তায় যাকে সামনে পেয়েছেন, সবার সাথেই অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও চিকিৎসকদের খবর দেওয়া হয়। তাঁরা দ্রুত ইউএনওর বাসভবনে ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

পরবর্তী পদক্ষেপ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে জামালগঞ্জে কর্মরত এই এসিল্যান্ড বেশ কিছুদিন ধরে পারিবারিক ও মানসিকভাবে কিছু জটিলতায় ভুগছিলেন।

স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রাতেই তাঁকে প্রথমে সিলেট এবং পরবর্তীতে পরিবারের সম্মতিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

যা বললেন ইউএনও শিল্পী রানী মোদক

নিজের নাম জড়িয়ে এসিল্যান্ডের এমন পোস্টে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ইউএনও শিল্পী রানী মোদক। তিনি বলেন—

 "তিনি কেন আমার নাম লিখেছেন, সেটাই আমার প্রশ্ন। আমি নিজেও বিষয়টি বুঝতে পারছি না।"

একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন আকস্মিক মানসিক বিপর্যয় এবং চাঞ্চল্যকর ফেসবুক পোস্ট প্রশাসনের অন্দরমহলে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। সহকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মপরিবেশের চাপ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন: 

রুহুল আমিন, ইত্তেফাক নিউজ।

বীর মুক্তিযোদ্ধার কারাবাস, রিমান্ড মঞ্জুর ও বিমানবন্দরের লাগেজ সিন্ডিকেট

 


নীরব কেন তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’?

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাগেজ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা, যাত্রীদের হয়রানি এবং চুরির ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কারাবাস এবং পরবর্তীতে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার ঘটনা বর্তমান সময়ের এক জ্বলন্ত ও জাতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন গত ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চরম ভোগান্তি ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন সাংসদকে হয়রানির প্রতিবাদ করেন।

যাত্রীদের লাগেজ কাটা, জিনিসপত্র চুরি এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোয় উল্টো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় পরদিন তাঁকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। শুধু তাই নয়, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কেবল কারাবাসই নয়, বরং আদালতের মাধ্যমে তাঁর কয়েকদিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করা হয়েছে।

প্রধান বিবেচ্য বিষয়সমূহ

  • যৌক্তিক প্রতিবাদ বনাম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিমানবন্দরের এই লাগেজ সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও দেশপ্রেমের পরিচায়ক।

  • কর্তৃপক্ষের দ্বিমুখী আচরণ: সাধারণ যাত্রীদের লাগেজ বিড়ম্বনা ও চুরির প্রতিকার না করে, উল্টো প্রতিবাদকারী মুক্তিযোদ্ধার ওপর মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড মঞ্জুরের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও দুর্নীতিরই প্রমাণ দেয়।

  • নির্বাক তথাকথিত ‘পক্ষের শক্তি’: সমাজের কোনো কোণে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিক্ষিপ্ত ক্ষোভ প্রকাশ পেলে যে সব দল বা গোষ্ঠী ‘মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা’ বলে গলা ফাটিয়ে ফেলেন, আজ একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা যখন বিমানবন্দরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কারাবন্দী ও রিমান্ডের শিকার, তখন তাদের সেই সরব উপস্থিতি কোথায়?

সাধারণ মানুষের তো অধিকারের কথা বাদই দিলাম—আজ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যখন দুর্নীতির প্রতিবাদ করে কারাগারে বন্দি হন এবং রিমান্ডের মুখোমুখি হন, তখন তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’র এই নীরবতা জনগণের মনে গভীর সংশয়ের জন্ম দেয়।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান কি তবে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের হাতিয়ারমাত্র? নাকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই আজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে?

আপনার কী মনে হয়? বিমানবন্দরের এই লাগেজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এই অবমূল্যায়ন, কারাবাস ও রিমান্ডের ঘটনায় আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?



সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণ


সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকাস্থ সিঙ্গাপুর হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় সেক্রেটারি জেনারেল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপির পক্ষ থেকে সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস উপলক্ষে একটি শুভেচ্ছাপত্র সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের হাতে হস্তান্তর করেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মি. মিশেল লি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে সিঙ্গাপুর সরকার ও জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এবং বিরোধী দলীয় নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য জনাব আলী আহমাদ মাবরুর।

এসময় জনাব মিয়া গোলাম পরওয়ার সিঙ্গাপুরের সরকার ও জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।