রাম মূর্তি আন্দোলনের নেপথ্যে অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী ও পতিত স্বৈরাচারের যোগসূত্র


গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম মূর্তি নির্মাণ স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন এখন দেশজুড়ে অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়। তবে ধর্মের পবিত্র আবরণের আড়ালে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং পতিত স্বৈরাচারী সরকারকে পুনর্বাসিত করার একটি সুগভীর রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট উন্মোচিত হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় ফ্রন্টলাইনে থেকে উসকানিমূলক নেতৃত্ব দিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন নিষিদ্ধ ও পতিত আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য 

আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী।

অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে চৈতালী চক্রবর্তীর বিতর্কিত ভূমিকা, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং তার রাজনৈতিক এজেন্ডার একটি বিশদ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:


১. ফ্রন্টলাইন অ্যাক্টিভিজম: ধর্মীয় আন্দোলনের আড়ালে দলীয় এজেন্ডা

অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের একজন কট্টর ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক আন্দোলনে তাকে সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে রাজপথে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে এবং কর্মসূচিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।


ধর্মীয় সমাবেশ ও আন্দোলনের মঞ্চ ব্যবহার করে তিনি প্রকাশ্যেই "জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু" স্লোগান দিয়ে এই আন্দোলনের আসল রাজনৈতিক চরিত্রকে জনসমক্ষে উন্মোচন করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ ধর্মীয় অধিকার রক্ষার লড়াই নয়, বরং পতিত আওয়ামী লীগকে রাজপথে পুনর্বাসিত করার একটি পরিকল্পিত ঢাল।


২. অন্তর্বর্তী সরকার ও জুলাই বিপ্লব নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্দোলনের মাঠ থেকে চৈতালী চক্রবর্তীর বেশ কিছু অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে, যা তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:

প্রধান উপদেষ্টাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে তিনি বলেন:

"ইউনুস বাটপারটা তো পালিয়ে চলে গেছে। কোনো অবস্থাতেই সমন্বয়কারীরা যেন পালাতে না পারে।"

জুলাই বিপ্লবকে অবমাননা ও হুমকি: ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লবকে কটাক্ষ করে তিনি প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে বলেন:

"জুলাই জুলাই বললে এখন গণধোলাই হবে। সেই দিন চলে আসছে এবং অটোমেটিক চলে আসছে।"

দেশ ধ্বংসের কাল্পনিক অভিযোগ: বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালিয়ে তিনি দাবি করেন, ডক্টর ইউনূস গত ১৭ মাস ধরে বাংলাদেশটাকে ধ্বংসের স্তূপে পরিণত করেছেন।


৩. শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার 'মায়াকান্না' ও ওপার বাংলার যোগসূত্র

অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি আন্দোলনের নামে মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ সুগম করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। তিনি প্রতিনিয়ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য পুজো দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন:

"শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ আসবে। জনগণ দুই-তিন কোটিরও বেশি মানুষ এই বাংলাদেশে আসবে, এয়ারপোর্টে আপনারা মিলিয়ে নিন। শেখ হাসিনার জন্য আমি প্রতিনিয়ত পুজো দিই। কারণ শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশ কেউ চালাতে পারবে না, একমাত্র উনার কাছেই এই বাংলাদেশ নিরাপদ।"

আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের আভাস:

এর আগে অন্য এক বিতর্কিত মন্তব্যে চৈতালী চক্রবর্তী দাবি করেছিলেন যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শেখ হাসিনাকে আবারো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে আনবেন। ভারতের উগ্রপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের বাংলাদেশ দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকির সাথে চৈতালী চক্রবর্তীর এই বক্তব্যগুলোর একটি গভীর যোগসূত্র ক্ষতিয়ে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

৪. জুলাই শহীদদের নিয়ে চরম দ্বিমুখী নীতি ও মায়াকান্না

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের মূল্যায়ন নিয়ে। জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে ৯ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্র-জনতা শহীদ হলেও, তাদের বিচার কিংবা তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চৈতালী চক্রবর্তী বা তার সমমনা সংগঠনগুলোকে কখনো রাজপথে কোনো জোরালো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

অথচ একটি মূর্তি নির্মাণ স্থগিতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে, সনাতনীদের জন্য **"আলাদা ভূখণ্ড বা প্রদেশ"**-এর মতো রাষ্ট্রদ্রোহী দাবি তুলে ঢাকাকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি "অল জঙ্গিবাদ হিন্দু উপর আক্রমণ করতা হে" বলে যে আন্তর্জাতিক মহলে মায়াকান্না কাঁদছেন, তা মূলত বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের অংশ।

অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর এই মারমুখী অবস্থান ও বক্তব্য প্রমাণ করে যে, গাইবান্ধার এই আন্দোলনটি কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ঘটনা নয়। ধর্মের পবিত্র ও সংবেদনশীল আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় এবং পতিত স্বৈরাচারী শক্তিকে পুনর্বাসিত করার সুগভীর রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, চৈতালী চক্রবর্তী তাদেরই একজন অন্যতম প্রধান রূপকার। দেশের শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই রাজনৈতিক কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন

 ও আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।


দিল্লির আধিপত্যবাদ রুখতে ‘নতুন সীমান্ত প্রহরী জাতি’ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান: ব্যারিস্টার ফুয়াদ

 


বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা

বাংলাদেশ আর কোনো ধরনের দাসত্ব বা নতজানু নীতি বরদাশ করবে না এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণ এখন এক ‘নতুন সীমান্ত প্রহরী জাতি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার ফুয়াদ। সাম্প্রতিক এক জনাকীর্ণ সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্র নীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেন।

ব্যারিস্টার ফুয়াদ সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে এবং এই দেশে কোনো ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন আর সম্ভব নয়।

১. দিল্লির আধিপত্যবাদ ও সীমান্ত আগ্রাসনের হুঁশিয়ারি

বক্তব্যের শুরুতেই ব্যারিস্টার ফুয়াদ ভারতের সীমান্ত নীতি এবং অনুপ্রবেশের নামে হয়রানির তীব্র নিন্দা জানান।

তিনি বলেন:

রাতের আঁধারে পুশ-ইন - হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিককে অনুপ্রবেশকারী সাজিয়ে রাত দুইটার সময় বিভিন্ন লোকেশনে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

 সীমান্ত হত্যা বন্ধের আলটিমেটাম: সীমান্ত হত্যার নামে যা শুরু হয়েছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ভারতের বিজেপি সরকারের সদস্য ও সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকদের মনোভাব থেকে দিল্লিকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঐতিহাসিক প্রতিরোধ: দিল্লির শাসকদের মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, অতীতেও বাংলার শাসকরা দিল্লির আধিপত্যবাদ মেনে নেয়নি এবং তাদের পরাজিত করার ইতিহাস এ দেশের রয়েছে।


২. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও ভারতের পররাষ্ট্র নীতি পরিবর্তনের আহ্বান

ব্যারিস্টার ফুয়াদ স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল। তবে ভারতকে তার বর্তমান বৈরী আচরণ ও ফরেন পলিসি (পররাষ্ট্র নীতি) পরিবর্তন করতে হবে।


"আমাদেরকে বাধ্য করবেন না দ্বিপাক্ষিক প্রতিবেশীসুলভ সেই সম্পর্ক থেকে একটা শত্রুতাপূর্ণ (Hostile) রিলেশনশিপে আসতে। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে এর পুরো দায়ভার ভারতবর্ষ এবং দিল্লির সরকারকেই নিতে হবে।"


৩. সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের দীর্ঘদিনের হয়রানি

বক্তব্যে তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থল ও বিমানবন্দরে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিত হেনস্থার শিকার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, চিকিৎসা, শিক্ষা বা ট্রানজিটের জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিরা দশকের পর দশক ধরে অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টাকে যেভাবে বিমানবন্দরে হয়রানি ও ফেরত পাঠানো হয়েছে, তা এই ধারাবাহিক অপমানেরই অংশ। একজন পতাকাবাহী ব্যক্তিত্বের সাথে এমন আচরণ করায় এবার বিষয়টি জনসমক্ষে এসেছে বলে তিনি জানান।


৪. বাংলাদেশ সরকারের প্রতি শক্ত অবস্থানের তাগিদ

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন/চলতি সরকারের উদ্দেশ্যে ব্যারিস্টার ফুয়াদ ‘চোখে চোখ রেখে’ কূটনীতি করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এখন আর কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন নেই। দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যতদিন সাহসী ভূমিকা রাখবে, দেশের সর্বস্তরের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পাশে থাকবে।


প্রতিবেদকের মন্তব্য:

ব্যারিস্টার ফুয়াদের এই বক্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জনগণের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। লাল-সবুজের পতাকাকে পাহারা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এবং কোনো ধরনের "দালাল বা দাস ফ্যাসিবাদ" যেন দেশে ফিরতে না পারে, সেই আহ্বান জানি

য়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।


ঢাকায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জামায়াত আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতার বৈঠক

 




নিজস্ব প্রতিবেদক ।

ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

আজ শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর একটি হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকের শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানান।

সৌজন্যমূলক এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ভ্রাতৃপ্রতিম দুই জাতির সম্পর্ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষা খাতের সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষই আশা প্রকাশ করেন, আগামীতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং তাঁর সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তুরস্ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের উদ্দেশে একটি সম্মানসূচক শুভেচ্ছাপত্র দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের বাংলাদেশ সফরের জন্য আবারও উষ্ণ অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়।

 বাজেট ও জননীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জামায়াতের





নিজস্ব প্রতিবেদক 

আসন্ন জাতীয় বাজেট অধিবেশনে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সংসদ সদস্যদের বলিষ্ঠ ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এমপি। তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য গণমুখী হতে হবে।

আজ শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এক বিশেষ দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দলের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে ৫ ও ৬ জুন (শুক্রবার ও শনিবার) ‘বাজেট, অর্থনীতি ও জননীতি: সংসদ সদস্যদের সক্ষমতা উন্নয়ন’ শীর্ষক এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশের প্রাক্কালে সংসদ সদস্যদের অর্থনৈতিক ও জননীতি বিষয়ক জ্ঞান এবং সংসদীয় দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। কর্মশালায় জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্বকারী ৭৭ জন সংসদ সদস্য (এমপি) অংশ নেন।

দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়নের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, বাজেট বিশ্লেষক ও নীতি-নির্ধারকেরা এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংসদ সদস্যরা কীভাবে জাতীয় বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সংসদে জনদাবিগুলো যৌক্তিকভাবে তুলে ধরতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন কৌশলগত পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দেন।

কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। তাঁরা সংসদীয় রীতিনীতি ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের আরও দক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

দেশ, জাতি ও জনগণের কল্যাণে সংসদ সদস্যদের মহান জাতীয় সংসদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা শেষ হয়।

সিলেটে চিকিৎসাধীন সাবেক এমপি ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে দেখতে হাসপাতালে বিরোধীদলীয় নেতা



নিজস্ব প্রতিবেদক 

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীকে দেখতে সিলেটের একটি হাসপাতালে গেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এমপি।

আজ সোমবার (১ জুন) রাত ১০টার দিকে তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন এই সাবেক সংসদ সদস্যের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আইসিইউতে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছ থেকে সাবেক এই এমপির সর্বশেষ চিকিৎসা পরিস্থিতির বিবরণ শোনেন। পরে তিনি মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর দ্রুত ও পরিপূর্ণ আরোগ্য কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন।

এ সময় বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

শিশু খাবারে হরিলুট

সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে 'বিষ' ছড়াচ্ছে দুর্নীতি!

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের পুষ্টির জোগান দিতে এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে চালু করা হয়েছিল ‘স্কুল ফিডিং প্রকল্প’। ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—বাচ্চাদের মুখে একটু পুষ্টিকর ও উন্নত মানের খাবার তুলে দেওয়া।

কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারের সীমাহীন লোভের বলি হচ্ছে লাখ লাখ নিরীহ শিশু। পুষ্টিকর খাবারের নামে তাদের পাতে দেওয়া হচ্ছে রাসায়নিকযুক্ত, বাসি, পচা এবং ওজনে কম নিম্নমানের খাবার। দেশের ১১টি উপজেলায় যমুনা নিউজের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শিশুদের খাবারের বাজেট থেকে কোটি কোটি টাকা লুটের এক ভয়ংকর চিত্র।

📊 এক নজরে প্রতিদিনের 'পকেট কাটা'র হিসাব


 🪱 পচা রুটি ও ‘ওজনহীন’ ডিম: টেকা দায়, খাওয়া তো দূরের কথা!

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপসার ও তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের যে মিড-ডে মিল দেওয়া হচ্ছে তা মুখে তোলার মতো নয়।

 ১. ফাঙ্গাস ও দুর্গন্ধযুক্ত রুটি

২৪ টাকা দামের ১২০ গ্রামের যে রুটি বাচ্চাদের দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত বাতাস দিয়ে ফুলিয়ে রাখা। রুটিটি ছিঁড়লেই ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়। অনেক রুটিতে স্পষ্ট ফাঙ্গাস (ছত্রাক) দেখা গেছে। তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক জানান, এটি এখন তাদের এখানে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২. ডিমের ওজনে শুভঙ্করের ফাঁকি

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন হতে হবে কমপক্ষে ৬০ গ্রাম। কিন্তু ডিজিটাল স্কেলে মেপে দেখা গেছে, কোনো ডিমই ৩৫-৪৫ গ্রামের বেশি নয়। পাবনার একটি খামারে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, ছোট ডিম কিনলে ঠিকাদারদের প্রতি ডিমে ১ টাকা বা তারও বেশি লাভ হয়।

ভীতিকর তথ্য: প্রতিদিন যদি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে ১ টাকা করে কম ওজনের ডিম দেওয়া হয়, তবে শুধু ডিমের আকার ছোট করেই প্রতিদিন কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকছে ৩০ লাখ টাকা!

🍌 ৩ টাকার কলা সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি!

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কলা সরবরাহে চলছে প্রকাশ্য লুটপাট। চুক্তিতে ১০০ গ্রাম ওজনের সাগর কলার দাম ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ টাকা। অথচ উত্তরের বৃহত্তম কলার হাট দুর্গাদহ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এই নিম্নমানের ছোট কলাগুলোর পিস মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা!

কলা তাড়াহুড়ো করে পাকানোর জন্য অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর কেমিক্যাল। ফলে সেগুলো বাইরে হলুদ হলেও ভেতরে শক্ত এবং কষযুক্ত থাকে। এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কলা খাওয়ালে আগে বাচ্চার কাশির ওষুধ কিনে রাখতে হয়।" ২৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর কলার বাজেট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি টাকা লোপাট করছে অসাধু চক্র।

 🏥 হাসপাতালের বিছানায় কোমলমতি শিশুরা

এই বিষাক্ত ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার খেয়ে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে মিড-ডে মিলের রুটি খেয়ে একসঙ্গে ২০ জন শিক্ষার্থী পেট ব্যথা ও বমি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

ছোট্ট রাইসা মুনতাহা এই খাবার খেয়ে দুদিন হাসপাতালে কাটানোর পর এখনো আতঙ্কে ভুগছে। তার মা জান্নাতুল আর্তনাদ করে প্রশ্ন তোলেন:

"সস্তা নিম্নমানের খাবার দিয়ে সন্তানের জীবন নিয়ে খেলছেন কারা? বাচ্চাদের কিছু হয়ে গেলে তারা কি আমার বাচ্চা ফিরিয়ে দিতে পারত?"

🚫 স্বাস্থ্যঝুঁকি: বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টাদের মতে, এই ধরণের বাসি, পচা এবং কেমিক্যালযুক্ত খাবার শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। এর ফলে শিশুদের ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস তো হচ্ছেই, পাশাপাশি খাদ্যের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের কারণে শিশুদের লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

 💬 কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি:

রাজশাহী বিভাগের ১২টি উপজেলায় পৌনে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর খাবার সরবরাহ করে 'গণ উন্নয়ন কর্মকা' নামের একটি সংস্থা। এত বড় অনিয়মের ব্যাপারে তাদের দায়সারা জবাব—"হাজার হাজার ডিমের মধ্যে সব চেক করা সম্ভব নয়।" তবে প্রকল্প পরিচালক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী যমুনা নিউজের সংগৃহীত প্রমাণ দেখে জানান, মাঠ পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে খাবার বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের এই অনুসন্ধানকে স্বাগত জানিয়ে তিনি দুর্নীতি দমনের আশ্বাস দেন।

📌 আমাদের বক্তব্য (Conclusion):

সরকার আগামীতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চায়। কিন্তু দুর্নীতির এই লাগামহীন ঘোড়াকে যদি এখনই টেনে ধরা না যায়, তবে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা কেবল অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের পকেটই ভারী করবে। আর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ—এই কোমলমতি শিশুরা—থেকে যাবে তিমিরেই।

আপনার কী মতামত?

আপনার এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মিড-ডে মিলের নামে কেমন খাবার দেওয়া হচ্ছে? কমেন্ট সেকশনে আমাদের জানান এবং 

পোস্টটি শেয়ার করে সবাইকে সচেতন করুন।

রাজনীতি কি আবেগ নাকি যুক্তি?

ফজলুর রহমানদের 'দ্বিচারিতা' ও আমাদের সংবিধান

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিতর্ক বেশ চাউর হয়েছে—মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা জামায়াতে ইসলামী করতে পারবে কি না? সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিসিং লয়ার এবং রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একটি বক্তব্যে দাবি করেছেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা জামায়াতে যোগ দিলে তা হবে ‘ডাবল অপরাধ’। একজন শিক্ষিত এবং সচেতন মানুষের মুখ থেকে এমন আবেগপ্রসূত ও অসাংবিধানিক বক্তব্য সত্যিই বিস্ময়কর।

 ১. ফজলুর রহমান বনাম আইনি বাস্তবতা

অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একজন বিজ্ঞ আইনজীবী। আইন ও সংবিধান তার নখদর্পণে থাকার কথা। কিন্তু তিনি যখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের রাজনৈতিক অধিকারকে ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—তিনি কি আইন বলছেন নাকি সস্তা রাজনৈতিক আবেগ ফেরি করছেন?

একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। আমাদের মনে আছে "সালেহা হত্যা মামলার" কথা। ডাক্তার ইকবাল সালেহাকে হত্যা করেছিলেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমা চাওয়া হলে তিনি তা নাকচ করে দিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল—একজন ডাক্তার জানেন শরীরের ঠিক কোথায় আঘাত করলে মানুষ মারা যায় (The doctor knows where to hit)। ফজলুর রহমান সাহেবের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। একজন লয়ার হিসেবে তার জানা উচিত কোনটি সংবিধানসম্মত আর কোনটি নয়। জেনেবুঝে যখন তিনি অসাংবিধানিক কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তিনি সুস্থ রাজনীতি নয়, বরং সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটছেন।

 ২. দলবদল কি কেবল নির্দিষ্ট মানুষের জন্য অপরাধ?

ফজলুর রহমান সাহেব একসময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, পরে তিনি দল পরিবর্তন করেছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি।

 যারা মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে বিএনপিতে গেছেন, যেমন—মেজর সামসুল হুদা (যিনি পরে নৌকায় উঠে এমপিও হয়েছিলেন)।

 আবার বিএনপি থেকে তথাকথিত ‘রাজাকারের দল’ বা জামায়াতের জোটে গিয়েছেন মেজর আখতারুজ্জামান

 বা 'কর্নেল অলির' মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

এমনকি বর্তমান জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতাও একসময় জাসদ বা অন্যান্য বামপন্থী ছাত্রসংগঠন করতেন।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—আপনারা দলবদল করলে সেটি 'কৌশল', আর সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা অন্য দলে গেলে সেটি 'ডাবল অপরাধ'? এই দ্বিচারিতা বা হিপোক্রেসি সাধারণ মানুষ এখন ধরে ফেলেছে।

৩. সংবিধানের প্রতি ‘নির্বাচিত’ সম্মান কেন?

ফজলুর রহমান সাহেবকে একটি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি সংবিধানের প্রতি অনেক শ্রদ্ধার কথা বলেন। সংবিধানের চতুর্থ তফসিল বা ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষক এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সর্বত্র প্রদর্শনের যে বাধ্যবাধকতা (আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত) আছে, তা কি এখন পালিত হচ্ছে? বঙ্গভবন বা গণভবন থেকে যখন ছবি সরানো হয়, বা গত অধিবেশনে যখন স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে ভিন্ন বিতর্ক ওঠে—তখন আপনি কেন চুপ থাকেন?

গ্যালারির বাইরে থেকে ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’-এর মতো গর্জন দেওয়া সহজ। সাহস থাকলে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো তুলুন। অন্যের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা প্রমাণ করুন।

 ৪. রাজাকার বনাম মুক্তিযোদ্ধা: বিভাজনের শেষ কোথায়?

মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। এটি একটি জাতীয় সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে রাজাকাররা আইডেন্টিফাইড ছিল, তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানে ছিল। কিন্তু আজ ৫৪ বছর পর এসেও কি আমরা কেবল এই বিভাজন নিয়েই পড়ে থাকব?

  সাগর-রুনি হত্যা হয়েছে; তারা কার সন্তান ছিল—মুক্তিযোদ্ধার নাকি রাজাকারের? সেটি কি বড় কথা, নাকি তারা যে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তাদের বিচার পাওয়া উচিত সেটি বড় কথা?

  অপরাধীকে তার পারিবারিক পরিচয় দিয়ে নয়, বরং তার কাজ দিয়ে বিচার করতে হবে।

৫. রাষ্ট্র কি কেবল অতীত নিয়ে বাঁচবে?

আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে কি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে প্রতিদিন পার্লামেন্টে ঝগড়া হয়? হয় না। তারা এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে। আর আমরা এখনো ১৯৭১, ১৯৫২ আর ১৯৯০ নিয়ে পড়ে আছি।

আমাদের আজ আলাপ করা উচিত ছিল:

 বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে।

 গার্মেন্টস খাতের সংকট ও জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে।

 তেল, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে।

রাজনীতি আবেগের জায়গা নয়, এটি যুক্তি ও সমাধানের জায়গা। ফজলুর রহমানদের মতো ব্যক্তিদের বোঝা উচিত, ‘আবেগ দিয়ে দেশ চলে না, সংসদও চলে না’। আমাদের প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে প্রশ্ন তোলা যাবে, সমালোচনা করা যাবে। বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করে প্রকৃত জনসমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়াই হবে প্রকৃত দেশপ্রেম।

মিথ্যা হুমকি আর সস্তা আবেগ ছেড়ে আসুন আমরা যুক্তির রাজনীতি করি। কালকের পার্লামেন্টে যদি সাহস থাকে, তবে প্রকৃত সাংবিধানিক সংকট নিয়ে কথা বলুন। জনগণ দেখতে চায় বাঘের গর্জন শুধু টিভির পর্দায় নয়, ন্যায়ের পক্ষেও সমানভাবে কাজ করে কি না।