সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে 'বিষ' ছড়াচ্ছে দুর্নীতি!
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের পুষ্টির জোগান দিতে এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে চালু করা হয়েছিল ‘স্কুল ফিডিং প্রকল্প’। ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—বাচ্চাদের মুখে একটু পুষ্টিকর ও উন্নত মানের খাবার তুলে দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারের সীমাহীন লোভের বলি হচ্ছে লাখ লাখ নিরীহ শিশু। পুষ্টিকর খাবারের নামে তাদের পাতে দেওয়া হচ্ছে রাসায়নিকযুক্ত, বাসি, পচা এবং ওজনে কম নিম্নমানের খাবার। দেশের ১১টি উপজেলায় যমুনা নিউজের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শিশুদের খাবারের বাজেট থেকে কোটি কোটি টাকা লুটের এক ভয়ংকর চিত্র।
📊 এক নজরে প্রতিদিনের 'পকেট কাটা'র হিসাব
🪱 পচা রুটি ও ‘ওজনহীন’ ডিম: টেকা দায়, খাওয়া তো দূরের কথা!
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপসার ও তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের যে মিড-ডে মিল দেওয়া হচ্ছে তা মুখে তোলার মতো নয়।
১. ফাঙ্গাস ও দুর্গন্ধযুক্ত রুটি
২৪ টাকা দামের ১২০ গ্রামের যে রুটি বাচ্চাদের দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত বাতাস দিয়ে ফুলিয়ে রাখা। রুটিটি ছিঁড়লেই ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়। অনেক রুটিতে স্পষ্ট ফাঙ্গাস (ছত্রাক) দেখা গেছে। তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক জানান, এটি এখন তাদের এখানে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. ডিমের ওজনে শুভঙ্করের ফাঁকি
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন হতে হবে কমপক্ষে ৬০ গ্রাম। কিন্তু ডিজিটাল স্কেলে মেপে দেখা গেছে, কোনো ডিমই ৩৫-৪৫ গ্রামের বেশি নয়। পাবনার একটি খামারে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, ছোট ডিম কিনলে ঠিকাদারদের প্রতি ডিমে ১ টাকা বা তারও বেশি লাভ হয়।
ভীতিকর তথ্য: প্রতিদিন যদি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে ১ টাকা করে কম ওজনের ডিম দেওয়া হয়, তবে শুধু ডিমের আকার ছোট করেই প্রতিদিন কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকছে ৩০ লাখ টাকা!
🍌 ৩ টাকার কলা সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি!
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কলা সরবরাহে চলছে প্রকাশ্য লুটপাট। চুক্তিতে ১০০ গ্রাম ওজনের সাগর কলার দাম ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ টাকা। অথচ উত্তরের বৃহত্তম কলার হাট দুর্গাদহ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এই নিম্নমানের ছোট কলাগুলোর পিস মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা!
কলা তাড়াহুড়ো করে পাকানোর জন্য অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর কেমিক্যাল। ফলে সেগুলো বাইরে হলুদ হলেও ভেতরে শক্ত এবং কষযুক্ত থাকে। এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কলা খাওয়ালে আগে বাচ্চার কাশির ওষুধ কিনে রাখতে হয়।" ২৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর কলার বাজেট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি টাকা লোপাট করছে অসাধু চক্র।
🏥 হাসপাতালের বিছানায় কোমলমতি শিশুরা
এই বিষাক্ত ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার খেয়ে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে মিড-ডে মিলের রুটি খেয়ে একসঙ্গে ২০ জন শিক্ষার্থী পেট ব্যথা ও বমি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
ছোট্ট রাইসা মুনতাহা এই খাবার খেয়ে দুদিন হাসপাতালে কাটানোর পর এখনো আতঙ্কে ভুগছে। তার মা জান্নাতুল আর্তনাদ করে প্রশ্ন তোলেন:
"সস্তা নিম্নমানের খাবার দিয়ে সন্তানের জীবন নিয়ে খেলছেন কারা? বাচ্চাদের কিছু হয়ে গেলে তারা কি আমার বাচ্চা ফিরিয়ে দিতে পারত?"
🚫 স্বাস্থ্যঝুঁকি: বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টাদের মতে, এই ধরণের বাসি, পচা এবং কেমিক্যালযুক্ত খাবার শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। এর ফলে শিশুদের ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস তো হচ্ছেই, পাশাপাশি খাদ্যের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের কারণে শিশুদের লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
💬 কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি:
রাজশাহী বিভাগের ১২টি উপজেলায় পৌনে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর খাবার সরবরাহ করে 'গণ উন্নয়ন কর্মকা' নামের একটি সংস্থা। এত বড় অনিয়মের ব্যাপারে তাদের দায়সারা জবাব—"হাজার হাজার ডিমের মধ্যে সব চেক করা সম্ভব নয়।" তবে প্রকল্প পরিচালক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী যমুনা নিউজের সংগৃহীত প্রমাণ দেখে জানান, মাঠ পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে খাবার বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের এই অনুসন্ধানকে স্বাগত জানিয়ে তিনি দুর্নীতি দমনের আশ্বাস দেন।
📌 আমাদের বক্তব্য (Conclusion):
সরকার আগামীতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চায়। কিন্তু দুর্নীতির এই লাগামহীন ঘোড়াকে যদি এখনই টেনে ধরা না যায়, তবে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা কেবল অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের পকেটই ভারী করবে। আর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ—এই কোমলমতি শিশুরা—থেকে যাবে তিমিরেই।
আপনার কী মতামত?
আপনার এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মিড-ডে মিলের নামে কেমন খাবার দেওয়া হচ্ছে? কমেন্ট সেকশনে আমাদের জানান এবং
পোস্টটি শেয়ার করে সবাইকে সচেতন করুন।


