কেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপ?
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধে অংশ নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালির মতো দেশগুলোর এই অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এটি আমাদের যুদ্ধ নয়: ইউরোপের স্পষ্ট বার্তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হরমুজ প্রণালীতে সামরিক শক্তি বাড়াতে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন, তখন ইউরোপীয় নেতাদের কণ্ঠস্বর বেশ কঠোর।
* জার্মানি: প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস পরিষ্কার জানিয়েছেন, "এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।" জার্মানি সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথেই হাঁটতে চায়।
* যুক্তরাজ্য: প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ন্যাটোর বাধ্যবাধকতা মানেই অন্যের ইচ্ছামতো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। ট্রাম্পের পরোক্ষ হুমকি সত্ত্বেও তিনি ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় অটল।
* ইতালি ও ফ্রান্স: দুই দেশই তাদের নৌবাহিনীকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
কেন এই দূরত্ব?
ইউরোপীয় নেতাদের এই ‘ভোলবদলের’ পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
* ইরাক যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি: ২০০৩ সালে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ ছিল একটি ভয়াবহ ও ব্যয়বহুল ভুল। ইউরোপ এখন আর বুশ আমলের সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না।
* অর্থনৈতিক সংকট: যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী। মুদ্রাস্ফীতি আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপের সরকারগুলো। নতুন করে যুদ্ধে জড়ানো মানে নিজেদের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।
* ন্যাটোর সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক: ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারাটি মূলত আত্মরক্ষার জন্য। ট্রাম্পের ইচ্ছামতো কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়া ন্যাটোর আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করছেন ইউরোপীয় সমরবিদরা।
ট্রাম্পের হুমকি ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ
ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইউরোপ যদি এই যুদ্ধে যোগ না দেয়, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব উল্টো ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা এখন বুঝতে পারছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে—শরণার্থী সমস্যা থেকে শুরু করে জ্বালানি সংকট পর্যন্ত।
আপাত দৃষ্টিতে-
ইউরোপীয় দেশগুলো হয়তো সরাসরি ইরানের পক্ষ নিচ্ছে না, কিন্তু তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা এবং ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা পরোক্ষভাবে ইরানের অবস্থানকেই শক্তিশালী করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই আগ্নেয়গিরি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইউরোপ আর অন্ধভাবে ওয়াশিংটনের হুকুম মানতে রাজি নয়।
আপনি কি মনে করেন ইউরোপের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে পারবে, নাকি এটি আটলান্টিক পাড়ের মিত্রতায় চিরস্থায়ী ফাটল ধরাবে? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।