ফজলুর রহমানদের 'দ্বিচারিতা' ও আমাদের সংবিধান
সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিতর্ক বেশ চাউর হয়েছে—মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা জামায়াতে ইসলামী করতে পারবে কি না? সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিসিং লয়ার এবং রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একটি বক্তব্যে দাবি করেছেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা জামায়াতে যোগ দিলে তা হবে ‘ডাবল অপরাধ’। একজন শিক্ষিত এবং সচেতন মানুষের মুখ থেকে এমন আবেগপ্রসূত ও অসাংবিধানিক বক্তব্য সত্যিই বিস্ময়কর।
১. ফজলুর রহমান বনাম আইনি বাস্তবতা
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একজন বিজ্ঞ আইনজীবী। আইন ও সংবিধান তার নখদর্পণে থাকার কথা। কিন্তু তিনি যখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের রাজনৈতিক অধিকারকে ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—তিনি কি আইন বলছেন নাকি সস্তা রাজনৈতিক আবেগ ফেরি করছেন?
একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। আমাদের মনে আছে "সালেহা হত্যা মামলার" কথা। ডাক্তার ইকবাল সালেহাকে হত্যা করেছিলেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমা চাওয়া হলে তিনি তা নাকচ করে দিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল—একজন ডাক্তার জানেন শরীরের ঠিক কোথায় আঘাত করলে মানুষ মারা যায় (The doctor knows where to hit)। ফজলুর রহমান সাহেবের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। একজন লয়ার হিসেবে তার জানা উচিত কোনটি সংবিধানসম্মত আর কোনটি নয়। জেনেবুঝে যখন তিনি অসাংবিধানিক কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তিনি সুস্থ রাজনীতি নয়, বরং সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটছেন।
২. দলবদল কি কেবল নির্দিষ্ট মানুষের জন্য অপরাধ?
ফজলুর রহমান সাহেব একসময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, পরে তিনি দল পরিবর্তন করেছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি।
যারা মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে বিএনপিতে গেছেন, যেমন—মেজর সামসুল হুদা (যিনি পরে নৌকায় উঠে এমপিও হয়েছিলেন)।
আবার বিএনপি থেকে তথাকথিত ‘রাজাকারের দল’ বা জামায়াতের জোটে গিয়েছেন মেজর আখতারুজ্জামান
বা 'কর্নেল অলির' মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
এমনকি বর্তমান জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতাও একসময় জাসদ বা অন্যান্য বামপন্থী ছাত্রসংগঠন করতেন।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—আপনারা দলবদল করলে সেটি 'কৌশল', আর সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা অন্য দলে গেলে সেটি 'ডাবল অপরাধ'? এই দ্বিচারিতা বা হিপোক্রেসি সাধারণ মানুষ এখন ধরে ফেলেছে।
৩. সংবিধানের প্রতি ‘নির্বাচিত’ সম্মান কেন?
ফজলুর রহমান সাহেবকে একটি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি সংবিধানের প্রতি অনেক শ্রদ্ধার কথা বলেন। সংবিধানের চতুর্থ তফসিল বা ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষক এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সর্বত্র প্রদর্শনের যে বাধ্যবাধকতা (আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত) আছে, তা কি এখন পালিত হচ্ছে? বঙ্গভবন বা গণভবন থেকে যখন ছবি সরানো হয়, বা গত অধিবেশনে যখন স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে ভিন্ন বিতর্ক ওঠে—তখন আপনি কেন চুপ থাকেন?
গ্যালারির বাইরে থেকে ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’-এর মতো গর্জন দেওয়া সহজ। সাহস থাকলে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো তুলুন। অন্যের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা প্রমাণ করুন।
৪. রাজাকার বনাম মুক্তিযোদ্ধা: বিভাজনের শেষ কোথায়?
মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। এটি একটি জাতীয় সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে রাজাকাররা আইডেন্টিফাইড ছিল, তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানে ছিল। কিন্তু আজ ৫৪ বছর পর এসেও কি আমরা কেবল এই বিভাজন নিয়েই পড়ে থাকব?
সাগর-রুনি হত্যা হয়েছে; তারা কার সন্তান ছিল—মুক্তিযোদ্ধার নাকি রাজাকারের? সেটি কি বড় কথা, নাকি তারা যে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তাদের বিচার পাওয়া উচিত সেটি বড় কথা?
অপরাধীকে তার পারিবারিক পরিচয় দিয়ে নয়, বরং তার কাজ দিয়ে বিচার করতে হবে।
৫. রাষ্ট্র কি কেবল অতীত নিয়ে বাঁচবে?
আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে কি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে প্রতিদিন পার্লামেন্টে ঝগড়া হয়? হয় না। তারা এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে। আর আমরা এখনো ১৯৭১, ১৯৫২ আর ১৯৯০ নিয়ে পড়ে আছি।
আমাদের আজ আলাপ করা উচিত ছিল:
বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে।
গার্মেন্টস খাতের সংকট ও জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে।
তেল, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে।
রাজনীতি আবেগের জায়গা নয়, এটি যুক্তি ও সমাধানের জায়গা। ফজলুর রহমানদের মতো ব্যক্তিদের বোঝা উচিত, ‘আবেগ দিয়ে দেশ চলে না, সংসদও চলে না’। আমাদের প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে প্রশ্ন তোলা যাবে, সমালোচনা করা যাবে। বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করে প্রকৃত জনসমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়াই হবে প্রকৃত দেশপ্রেম।
মিথ্যা হুমকি আর সস্তা আবেগ ছেড়ে আসুন আমরা যুক্তির রাজনীতি করি। কালকের পার্লামেন্টে যদি সাহস থাকে, তবে প্রকৃত সাংবিধানিক সংকট নিয়ে কথা বলুন। জনগণ দেখতে চায় বাঘের গর্জন শুধু টিভির পর্দায় নয়, ন্যায়ের পক্ষেও সমানভাবে কাজ করে কি না।

0 comments: