বিশেষ প্রতিবেদন: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পকে ঘিরে সামনে এসেছে ভয়াবহ এক দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের চিত্র। অনিয়মের পরিধি ও ধরণ এতটাই অস্বাভাবিক যে, সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘বালিশ কাণ্ডকেও’ এটি পেছনে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহাসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)-এর সাম্প্রতিক এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকার হরিলুটের এই চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল চিত্র: যা উঠে এসেছে সিএজি রিপোর্টে
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের সুযোগ থাকে। কিন্তু শাহজালাল থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে কোনো তোয়াক্কা না করেই ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়তি অর্থ।
রিপোর্টে উঠে আসা প্রধান অনিয়মগুলোর একটি খতিয়ান:
অনুমোদনহীন কেনাকাটা ও ব্যয়: যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্পের অন্তত ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তন করে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৩,২০০ কোটি টাকা।
ফিতা কাটার উৎসব: কেবল আংশিক উদ্বোধনের ‘ফিতা কাটা’ ও আনুষ্ঠানিকতার জন্যই খরচ দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা!
পুকুর খননের নতুন রূপ: প্রকল্পে একটি পুকুর নির্মাণের নাম করে ঠিকাদারকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ ‘গুগল আর্থ’-এর পুরনো স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়—সেখানে আগে থেকেই একটি জলাশয় বিদ্যমান ছিল। সেটিকে সামান্য সংস্কার করেই নতুন পুকুর হিসেবে মোটা অঙ্কের বিল তোলা হয়েছে।
মাটি ফেলার নামে অর্থ আত্মসাৎ: প্রকল্প এলাকা থেকে মাটি কেটে ৬ কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ফেলা হয়েছে মাত্র ২ কিলোমিটারের মধ্যে। কিন্তু বিলে সম্পূর্ণ ৬ কিলোমিটার দূরত্বের পরিবহন খরচ দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৮৩ কোটি টাকা।
গাছ কেনা ও পরিচর্যার পুকুরচুরি: সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য যেসব গাছের বাজারমূল্য সাধারণত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, নথিপত্রে সেগুলোর একেকটির দাম ধরা হয়েছে ৫,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত! শুধু এই গাছের পরিচর্যা করতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৪.৮ কোটি টাকা।
সরঞ্জাম ও জ্বালানিতে চোখ কপালে তোলা খরচ:
ডিজেল পাম্প সরবরাহ: ১২ কোটি টাকা
ইউপিএস সরবরাহ: ৪৮ কোটি টাকারও বেশি
জ্বালানি তেল: ৪১ কোটি টাকা
অগ্রিম ও বিশেষ সুবিধা: চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে আগাম কাজের খরচ এবং কাজের গতি বাড়ানোর অজুহাতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
ব্যয় সংশোধনের আড়ালে বিপুল অর্থ বৃদ্ধি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, তখন প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩,৫০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে দফায় দফায় নকশা ও শর্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকায়"
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে করা এসব অসংগতিপূর্ণ ও বিপুল ব্যয়কে এখন পোস্ট ফ্যাক্টো’ (পরবর্তী অনুমোদন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
প্রকল্পের অনিয়ম ঢাকা দিতে ‘পোস্ট ফ্যাক্টো’ অনুমোদনের এই চেষ্টাকে তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের নীতি-বিশেষজ্ঞ ও এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা।
"চিহ্নিত অনিয়ম ও দুর্নীতিগুলোকে যদি পরবর্তী অনুমোদনের (পোস্ট ফ্যাক্টো) মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে তা হবে আরেকটি বড় অপরাধ বা দুর্নীতির শামিল। এতে করে ভবিষ্যতে সবাই অনিয়ম করে পরে ‘সেটেলমেন্ট কমিটি’র মাধ্যমে পার পাওয়ার সুযোগ খুঁজবে।"
ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
"কোনো অবস্থাতেই এই অনিয়মকে পোস্ট ফ্যাক্টো অনুমোদন দেওয়া যাবে না। বরং পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।"
কাজী ওয়াহিদুল আলম, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ।
সরকারের অবস্থান
থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের এই ভয়াবহ দুর্নীতি প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তার প্রতিটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে এবং এর সাথে জড়িত প্রদেয় কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে উন্নয়ন ও অগ্রগতির খোলসে যেভাবে গণমানুষের ট্যাক্সের টাকা লুটপাট করা হয়েছে, শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে এই মেগা-লুটপাটের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় নাকি অন্য সব অনিয়মের মতো এটিও কাগজের কলমেই চাপা পড়ে যায়!

0 comments: