সু চিকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির আহ্বান " রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ কর "
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান নিপীড়নের নিন্দা জানিয়েছেন হলিউডের হার্টথ্রব নায়িকা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। একই সঙ্গে দেশটির নেত্রী ও শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চিকে আর নীরব না থেকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার বলিউডের এই কুইন সাপ্তাহিক উয়েল্ট অ্যাম সনত্যাগকে বলেন, ‘এটা একেবারেই পরিষ্কার যে সেনাবাহিনীকে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এবং শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরতের অনুমতি দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দেয়া উচিত।’
মার্কিন এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমরা সকলেই চাই যে, এই অবস্থায় অং সান সু চি মানবাধিকারের কণ্ঠস্বর হবেন।’
রাখাইনের সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানানোয় বিশ্বজুড়েই ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। ২০১২ ধর্মীয় সহিংসতার সময় তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এসময় শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়; বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা।
শনিবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, রাখাইনের সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
সূত্র : এপি।
এসআইএস/জেআইএম


মগের মুল্লুক এবং মমতা ব্যানার্জি
১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় আরাকান (রাখাইন প্রে) থেকে কক্সবাজারে প্রথম ২,৫০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে আসে। তাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে খোলা হয় আশ্রয়শিবির। ১৯৯৪ সালে তদানীন্তন মিয়ানমার সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়। কিন্তু কিছু রোহিঙ্গা ফিরতে পারলেও বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ফিরতে পারেননি। যারা ভাবছেন, আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারবে, তারা আমার মনে হয় এই ইতিহাস স্মরণ করছেন না। 

বর্তমানে রোহিঙ্গা সমস্যা আরো প্রবল আকার ধারণ করেছে। আর এটা সৃষ্টি হতে পেরেছে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে পাঠানো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ অত্যাচারের কারণে। অনেক মিথ্যা কথা প্রচার করা হচ্ছে মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে। মিয়ানমার সরকার বলছে, যাদের উল্লেখ করা হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমান, তারা নাকি অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে আরাকানে যাওয়া ব্যক্তি; কিন্তু আমরা দেখছি রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তান কোলে আসছেন। এই শিশু সন্তানরা নিশ্চয় চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে আরাকানে যায়নি। নিশ্চয় এরা জন্মেছে আরাকানে। আর তাই জন্মসূত্রেই এদের বলতে হয় আরাকানি। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এদেরও বলছে রাষ্ট্রবিহীন মানুষ। যেটা আন্তর্জাতিক আইনে বলা যায় না। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২৩ সালে যে আদমশুমারি হয়, তাতে দেখা যায় যে, আরাকানের জনসমষ্টির শতকরা ৩৬ ভাগ মুসলমান। এ থেকে অবাধেই অনুমান করা চলে যে, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে আরাকানে বাংলাভাষী মুসলমান যাওয়ার যে কথা মিয়ানমার সরকার বলছে, তা সত্য নয়।
বাংলাভাষী মুসলমান সেখানে অনেক আগে থেকেই আছেন। তারা হঠাৎ যাওয়া নয়। আমরা ইতিহাসে দেখি আরাকানের রাজারা একসময় ছিলেন বাংলার সুলতানদের সামন্ত। আরাকান একটা পৃথক স্বাধীন রাজ্য ছিল না। সর্বোপরি তা ছিল না বর্তমান মিয়ানমারের কোনো অংশ।
মিয়ানমার সরকার এখন চাচ্ছে এই সমগ্র ইতিহাসকেই অস্বীকার করতে। মিয়ানমারের সৈন্যরা নিরস্ত্র বেসামরিক জনসমষ্টির ওপর যে ভয়াবহ অত্যাচার চালাচ্ছে তাকে বলতে হবে যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন অনুসারে। মিয়ানমার যেভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, তাকে বলতে হবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের অঘোষিত যুদ্ধ। একে রোধ করতে হবে পাল্টা সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। অন্য কোনোভাবে এর কোনো সমাধান আসতে পারে বলে আর মনে হচ্ছে না। কেননা সমস্যাটা সৃষ্টি হতে পেরেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের ফলে। তাই সমস্যাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানত সামরিক। এই সমস্যাকে আর বিবেচনা করা চলে না আর কোনো রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে। আমাদের দেশে অনেকে অং সান সু চির কঠোর সমালোচনা করছে। কিন্তু যেটা বোঝা দরকার, তা হলো মিয়ানমার এখনো চলছে সেনা শাসনে। সু চির এখানে কিছু করার বাস্তব ক্ষমতা নয়। মিয়ানমারের সামরিকবাহিনী পরে যারা দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারা হলেন থেরাবাদী বৌদ্ধভিক্ষু। এরা হলেন খুবই ধর্মান্ধ। আজকের মিয়ানমারের রাষ্ট্রধর্ম হলো থেরাবাদী বৌদ্ধধর্ম। সেনাশক্তি ও ধর্মীয় উন্মাদনা একত্রে সৃষ্টি করতে পারছে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন। বল প্রয়োগের বিপক্ষে বল প্রয়োগ ছাড়া এর কোনো বিহিত হতেই পারে না।

পৃথিবীর রাজনীতি এখনো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বল প্রয়োগের ভিত্তিতে। ক’দিন আগে আমরা দেখলাম হিমালয় সীমান্তে দোকলাম বা দাংলাং নিয়ে চীন-ভারত যুদ্ধ বাধার অবস্থার সৃষ্টি হতে। চীন সামরিক দিক থেকে কড়া হতে পারার ফলে ভারত এখন বলছে, দাংলাং নিয়ে নতুন সীমান্ত চুক্তি করার কথা। দাংলাং ভারতের জায়গা নয়। ভুটানি ভাষায় দাংলাং হলো দোকলাম। জায়গাটা ভুটানের সীমানার মধ্যে পড়লেও পড়তে পারে; কিন্তু ভারতের সীমানার মধ্যে পড়ে না। তবুও ভারত ভুটানের পক্ষ নিয়ে সেখানে পাঠিয়েছিল সৈন্য। কিন্তু এখন সে চীনের সামরিক শক্তির চাপে সৈন্য সরিয়ে নিতে যাচ্ছে। চীন যদি ভারতের তুলনায় সামরিক দিক থেকে দুর্বল, তবে এভাবে দাংলাং সমস্যার সমাধান হতে পারত না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন রোহিঙ্গা সমস্যার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সমর্থন দিতে চাচ্ছে, আমরা তা জানি না। কেননা রোহিঙ্গা সমস্যা ভারতের কোনো সমস্যা নয়। এটা বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সমস্যা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ। কেননা, তিনি রোহিঙ্গাদের আরাকানে থাকার দাবিকে সমর্থন দিচ্ছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিকে তিনি সমর্থন দিচ্ছেন না। পশ্চিমবঙ্গ, যার নাম এখন হতে যাচ্ছে কেবলই বঙ্গ; তার জনসমষ্টি যদি বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়, তবে শিলিগুড়ির ২৭ কিলোমিটার করিডোরের মধ্য দিয়ে ভারত সরকার মিয়ানমারকে কোনো সামরিক সাহায্য দিতে পারবে না। অন্য দিকে নরেন্দ্র মোদির সরকার যদি মিয়ানমার সরকারের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে, তবে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের কারণে, চীন আর আগের মতো মিয়ানমারের পক্ষ নেবে বলে মনে হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে বলেই মনে হচ্ছে। অন্য দিকে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব, বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যেভাবে বাংলাদেশের পক্ষে এসে দাঁড়াচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের উচিত হবে শক্তির যুক্তিকে শক্তি দিয়েই মোকাবেলা করা। যুদ্ধ কাম্য নয়। কিন্তু জাতিতে জাতিতে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, যুদ্ধ হচ্ছে এবং হবে।

আমরা যখন অতীতের দিকে তাকাই, তখন দেখি সুবেদার শায়েস্তা খাঁ বাদশাহ আরঙ্গজেবের নির্দেশে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের যুদ্ধের মাধ্যমে পরাজিত করে দমন করেছিলেন। পর্তুগিজ ও মগেরা চট্টগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ যুদ্ধ জয়ের পর চট্টগ্রাম শহর ও বন্দরের নতুন নাম রেখেছিলেন ইসলামাবাদ। অতীতে যুদ্ধ ছাড়া এই অঞ্চলে শান্তি স্থাপিত হতে পারেনি। আমার মনে হয় এখন আরাকানেও পারবে না। আরাকান রাজসভায় খ্রিষ্ট্রীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে একাধিক মুসলমান বাংলাভাষী কবির কদর হয়েছিল। এদের মধ্যে দৌলত কাজী ও আলাওল বিশেষ প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন। দৌলত কাজী সতী ময়নামতি কাব্যের প্রস্তাবনায় লিখেছেন :

কর্নফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী।
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ-অবতারী॥
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার।
নাম শ্রী সুধর্ম রাজা ধর্মে অবতার॥
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন॥

এখানে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, দৌলত কাজী বলছেন, সুধর্মা হচ্ছেন মগধ বংশের রাজা। তিনি বলছেন না, সুধর্মা হচ্ছেন কোনো আরাকানি রাজবংশের রাজা। অতীতে মগধ বলতে বোঝাত বর্তমান বিহারের দক্ষিণ ভাগকে।
মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হতো, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেকের মতে, মগ শব্দের উদ্ভব হয়েছে প্রাচীন মগধের নাম থেকে। চট্টগ্রামের একদল লোককে বলা হয় বড়–য়া মগ। এরা দাবি করেন যে, এদের পূর্বপুরুষ চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসেছিলেন মগধ থেকে। আরাকানে একসময় মগধ থেকে আসা রাজবংশ রাজত্ব করেছেন, এ রকম কথা অনেকেই বলেন। তাদের মতে মগ কথাটার উদ্ভব হতে পেরেছে মগধ থেকে।
অন্য দিকে অনেকের মতে মগ কথাটা উদ্ভব হয়েছে ‘মঙ’ শব্দ থেকে। মঙ বলতে বোঝাত, বর্তমান মিয়ানমারের অধিবাসীদের। এরা ছিল খুবই দুর্দান্ত ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির। অতীতে আরাকানে এসে একদল মঙ বসবাস শুরু করে। তারাই পুর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশে সৃষ্টি করেছিল বিরাট অরাজক অবস্থা, যা এখনো স্মৃতি হয়ে আছে ‘মগেরমুল্লুক’ হিসেবে। মগেরমুল্লুক বলতে বোঝায় অরাজক দেশ। আসলে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে আগত ম্রনমা সৈন্যরা আরাকানে বিরাট অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এটা আমাদের উপলব্ধিতে থাকা দরকার।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
ইবনে গোলাম সামাদ
সূত্র: নয়া দিগন্ত।
 ৮৫ ভাগ রোহিঙ্গা শিশু রোগাক্রান্ত
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে লাইন দিয়ে হাঁটতে থাকা রোহিঙ্গাদের সারি এখন টেকনাফ শহরবাসীর চেনা দৃশ্য। গত ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সে দেশের সোনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপরে যে গণহত্যা ও বিতাড়ন শুরু করেছে, তা এখনো চলছে।
প্রতিদিনই টেকনাফ শহরের নে-টং পাহাড়ের পাশ থেকে দেখা যায়, নাফ নদীর পূর্ব পারে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। সন্ধ্যার পরে সেই ধোঁয়ার ভেতরে আগুনের শিখাও চোখে পড়ে। আগুন লাগানোর দৃশ্য একেবারে দক্ষিণের সেই শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত নাফ নদীর পাশের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো থেকে থেকে চোখে পড়ে। ঘরবাড়িহারা, দেশ থেকে উৎখাত হওয়া হাজার হাজার শিশু, নারী, জোয়ান, বৃদ্ধ প্রাণ বাঁচাতে প্রায় একরকম শূন্য হাতেই জেলে নৌকায় বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে আসছে। সেখান থেকে তাদের বিজিবির তত্ত্বাবধানে সরিয়ে আনা হচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার নতুন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।
ইতিমধ্যেই টেকনাফ ও উখিয়ায় প্রায় নতুন আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। এই বিপুল জনস্রোত সামাল দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি প্রশাসনের ছিল না। অত্যন্ত দ্রুত বাড়তে থাকা এই জনগোষ্ঠীর আবাসন, খাদ্য, সুপেয় পানি, জ্বালানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা—এমন মৌলিক চাহিদাগুলোর ব্যবস্থা করার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ কোনোটি প্রশাসনের ছিল না।
প্রাথমিকভাবে অনেকে টেকনাফের লেদা ও নয়াপাড়া এবং উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালির পুরোনো রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠে পড়েন। পরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবুনিয়া পাহাড়ে এবং উখিয়ার থাইংখালিতে দুটি বড় আকারের আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়। এই দুই আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তিন লাখের মতো। এ ছাড়া টেকনাফের নেচার ক্যাম্প ও উখিয়ার জামতলি, বাগগুনা, মক্কার বিল প্রভৃতি এলাকায় অনেক ছোট ও মাঝারি বস্তি করে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন।
এসব আশ্রয়কেন্দ্রের হাজার হাজার আশ্রিত রোহিঙ্গারা সর্দি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তারা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফের) শিশু সুরক্ষা প্রধান জ্যঁ লিবে গত মঙ্গলবার আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে কক্সবাজারে এক বিবৃতিতে বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু এবং এরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক দিনে আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, এখন এসব শিশু ব্যাপকভাবে ডায়রিয়া, সর্দি, জ্বরসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবুনিয়ার নতুন আশ্রয়কেন্দ্রে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মেডিকেল ক্যাম্প করে চিকিৎসা চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। ক্যাম্পের চিকিৎসক মুজাইয়ান হোসেন বললেন, রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮৫ জনই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন এত রোগী আসছে যে তারা তাদের নামের তালিকা করার অবকাশ হচ্ছে না। অধিকাংশই পানিবাহিত রোগ, সর্দি, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।

উখিয়ার থাইংখালির নতুন আশ্রয়কেন্দ্রের জোবায়ের হোসেনের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনজনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তিনি এসেছেন মংডুর বলি বাজার থেকে। এই আশ্রয়কেন্দ্রের নূর বেগমের দুই মেয়ে ভুগছে সর্দি-জ্বরে। এ আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ রোগে ভুগছে। এখানে আশ্রিতের সংখ্যা এক লাখের বেশি।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় ন্যূনতম তিন দিন থেকে কারও কারও ১২ থেকে ১৩ দিনও সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ সময় অর্ধাহার অনাহারে থেকে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। এর পরে বাংলাদেশে এসেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে দুই-তিন দিন পেরিয়ে গেছে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। রুগ্‌ণ দুর্বল শরীরে বৃষ্টিতে ভিজে রোহিঙ্গারা জ্বর, সর্দি, নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
টেকনাফ ও উখিয়ার কোনো নতুন আশ্রয়কেন্দ্রেই বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের পাশের পাহাড়ি ছড়ার অনিরাপদ ঘোলা পানি খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন।
স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এড়াতে রোহিঙ্গা শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানান কক্সবাজারে সিভিল সার্জন আবদুস সালাম। তিনি জানান, উখিয়াতে ২১টি এবং টেকনাফে ১৫টি এই ৩৬টি সরকারি মেডিকেল টিম জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি আরও প্রায় অর্ধ শতাধিক সংস্থা ও সংগঠনের মেডিকেল টিম আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিতরণ করছে।
সূত্র: প্রথম আলো 
মিয়ানমার-সেনাবাহিনীর-ওপর-নিষেধাজ্ঞার-আহ্বান
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার ঠেকাতে দেশটির ওপর চাপ বাড়াতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সেই সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বৈঠকের আগ মুহূর্তে মিয়ানমারের চলমান সংকট সমাধানে চাপ দেওয়ার জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে আজ সোমবার এ আহ্বান এল।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, চলমান সংকটের মুখে মিয়ানমারের চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে গেছে। যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু রয়েছে। সেখানে তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শরণার্থী যোগ হচ্ছে। এ কারণে সেখানে কর্মরত সাহায্য সংস্থাগুলো ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
গতকাল রোববার মিয়ানমার সরকার সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসা সবাইকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের দাবি, গত আগস্ট মাসে পুলিশের চেকপোস্ট ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যারা হামলা চালিয়েছিল, এই সব শরণার্থীর সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে।
এই শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। অধিবেশনে তিনি মিয়ানমারের ওপর আরও বেশি চাপ দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবেন।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরডব্লিউ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান অত্যাচারের শাস্তিস্বরূপ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী জাতিগত অভিযান চালাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চলমান এই সংকটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এইচআরডব্লিউর এশীয় অ্যাডভোকেসি পরিচালক জন সিফটন বলেন, ‘আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লে মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেন।’
সূত্র: প্রথম আলো