মুনাফার রাজ্যে মানবিকতার বলি




নবীন ফ্যাশন ও এক ‘অদৃশ্য’ দেশপ্রেমিকের প্রস্থান

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে। মগবাজারের বিশাল সেন্টারের ‘নবীন ফ্যাশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের দেশ ছাড়ার খবরটি কেবল একজন ব্যবসায়ীর গল্প নয়; বরং এটি আমাদের সমাজ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নিদারুণ প্রতিফলন।

ঘটনার নেপথ্যে: অপরাধ যখন ‘মানবিকতা’

অভিযোগ উঠেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে পাঞ্জাবি বিক্রি করছিলেন নবীন ফ্যাশনের মালিক। যেখানে বড় বড় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ৩০০ টাকার পাঞ্জাবি ৫০০০ টাকায় বিক্রি করে পকেট ভারী করতে মরিয়া, সেখানে এই ব্যবসায়ী ‘অল্প লাভে’ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু এই মানবিকতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। অভিযোগের মূল বিষয়গুলো হলো:

 * ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ক্ষোভ: কম দামে পণ্য বিক্রি করায় অন্য মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের বিশাল অংকের লাভে টান পড়ে।

 * প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ: ‘প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু’ পরিচয় দিয়ে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হাতিরঝিল থানার পুলিশকে ব্যবহার করে দোকানটি বন্ধ করে দেন।

 * ভয়াবহ হুমকি: ব্যবসা গুটিয়ে না নিলে সন্তানদের ‘এতিম’ করে দেওয়ার মতো চরম হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

 * নিভৃতে দেশত্যাগ: সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং আইনি সহায়তার আশা না পেয়ে গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে সন্ধ্যায় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

গণমাধ্যমের নীরবতা: প্রশ্ন যখন সাংবাদিকদের দিকে

এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

১. সেলফ-সেন্সরশিপ: কেন এমন একটি মানবিক এবং চাঞ্চল্যকর খবর মিডিয়ায় গুরুত্ব পেল না? ‘প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু’ বা প্রভাবশালী কারো নাম জড়িয়ে গেলে কি কলম থমকে যায়?

২. ফ্যাসিবাদ তৈরির কারিগর: অতীতে যেভাবে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে বা ব্যক্তিবিশেষকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে ‘ফ্যাসিস্ট’ বানানো হয়েছিল, বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতা কি সেই একই পথে হাঁটছে?

> "যে দেশে ভালো কাজের পুরস্কার হয় দেশত্যাগ এবং হুমকি, সে দেশে সুস্থ ধারার ব্যবসা বা মানবিকতা টিকে থাকা অসম্ভব।"

> আমাদের সমাজ কোথায় যাচ্ছে?

একজন মানুষ যখন নিজের দেশের মানুষের জন্য সস্তায় পোশাক জোগান দিয়ে ‘অপরাধী’ হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও বাজার ব্যবস্থা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। প্রধানমন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে যখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়, তখন আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়।


মগবাজারের সেই ব্যবসায়ীর দেশ ছেড়ে যাওয়া আমাদের সম্মিলিত নৈতিক পরাজয়, সেই সাথে এটি মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত। সত্যটুকু উন্মোচন করে দোষীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।


0 comments: