নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ ই নিউজ |
প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গভীর সংকট দৃশ্যমান। জনসেবার মহান ব্রত ছাপিয়ে রাজনীতি এখন অনেকের কাছে জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘ দেড় যুগ থাকার পরও বিশাল অংকের ঋণখেলাফি এবং তৃণমূল পর্যায়ে দখলদারিত্বের যে ভয়াবহ তথ্য সামনে আসছে, তা নাগরিক মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মপদ্ধতি নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
১. জীবিকার মডেল: কর্মসংস্থান বনাম দখলদারিত্ব
রাজনৈতিক কর্মীদের জীবনধারণের পদ্ধতি নিয়ে বর্তমানে দুটি ভিন্নধর্মী ধারার কথা আলোচিত হচ্ছে:
বিএনপির 'এলাকা ভাগ' পদ্ধতি: অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির তৃণমূলের একাংশ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে ব্যবহার করছে। এলাকা ভাগাভাগি, টেম্পো স্ট্যান্ড বা ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে গত দেড় বছরে প্রায় ৭,০০০ কর্মীকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে, যা একই সাথে দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
জামায়াতের 'প্রতিষ্ঠান নির্ভর' মডেল: বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী তাদের কর্মীদের জন্য দলীয় বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে। এতে কর্মীরা সরাসরি চাঁদাবাজিতে না জড়িয়ে নির্দিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, যা তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে সুসংগঠিত রাখতে সাহায্য করে।
২. ক্ষমতার বাইরে থেকেও ৫,৭৮৭ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ১৭-১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পরেও বিএনপির ১৩ জন প্রাক্তন এমপির নামে ৫,৭৮৭ কোটি টাকার ঋণখেলাফি তথ্য। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার ভিত্তিতে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
ঋণখেলাপির চিত্র এক নজরে:
মোট ঋণখেলাপির পরিমাণ ৫,৭৮৭ কোটি টাকা ।
সংশ্লিষ্ট নেতা ১৩ জন প্রাক্তন সংসদ সদস্য |
সবচেয়ে আলোচিত ঋণ :
আবদুস সালাম (১,৭০০ কোটি টাকা) |
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব: আমানতকারীরা টাকা না পেলেও প্রভাবশালীরা টাকা আটকে রেখেছেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব ঋণখেলাফিদের বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নেওয়া ব্যাংকিং খাতের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
৩. ডিজিটাল টেন্ডারে এনালগ লুটপাট:
ই-জিপি (e-GP) বা অনলাইন টেন্ডার পদ্ধতি চালু হলেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়নি সরকারি কাজ। যোগ্য ঠিকাদারদের ভয় দেখিয়ে এবং লিয়াজোঁর মাধ্যমে কাজ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অহরহ। একটি ঘটনায় দেখা যায়, সর্বোচ্চ দরদাতা ৪৭ লক্ষ টাকা প্রস্তাব করলেও তাকে সরিয়ে দিয়ে ৪০ লক্ষ টাকা প্রস্তাবকারীকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রের রাজস্বের ক্ষতি।
৪. জনগণের আস্থার সংকট:
সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংকে জমানো টাকা তুলতে গিয়ে ফিরে আসছে, তখন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাফি হওয়ার খবর তাদের হতাশ করছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, অথচ নিজেদের ঘরেই দুর্নীতির পাহাড় জমে থাকে, তখন রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি ধসে পড়ে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে দলগুলোকে তাদের কর্মীদের অর্থনৈতিক সংস্থানের জন্য সম্মানজনক পথ দেখাতে হবে। একই সাথে ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবশালী ঋণখেলাফিদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। নওগাঁ ই নিউজ মনে করে, শুধু নেতার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক উপার্জনের পদ্ধতির পরিবর্তনই এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামা (নির্বাচন কমিশন)।
জাতীয় দৈনিকসমূহ: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও বণিক বার্তা।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক টকশো।
ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। নওগাঁ ই নিউজ কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য পোষণ করে না, বরং জনস্বার্থে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বিশ্লেষণাত্মক চিত্র তুলে ধরেছে।

0 comments: