সংকটে বরাবরই অগ্রভাগে ডা. শফিকুর রহমান ও জামায়াত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বারবার নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোতে দলটির সময়োচিত পদক্ষেপ এবং আমিরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০২২ সালের সিলেট বন্যা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ফেনী-কুমিল্লা এবং বর্তমান ২০২৬ সালের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভয়াবহ বন্যায় জামায়াতের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

২০২২: সিলেটের মহাসংকটে মানবিকতার অনন্য নজির

২০২২ সালে সিলেটের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় যখন চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তখন তৎকালীন সরকারের উদাসীনতা ও লোকদেখানো কার্যক্রমের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল জামায়াত।

তহবিল গঠন: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন সরকারি তহবিল থেকে মাত্র ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়ে সমালোচিত হয়েছিল, সেখানে জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে **৫ কোটি টাকার বিশাল তহবিল** গঠন করে।

সরেজমিনে আমির: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যখন হেলিকপ্টারে করে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, ঠিক তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে বন্যার্তদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে যান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। নগদ অর্থ ও পুনর্বাসন সামগ্রী নিয়ে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।

২০২৪: ফেনী-কুমিল্লা-নোয়াখালীর মহাপ্লাবনে দ্রুত সাড়া

২০২৪ সালের আগস্টে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী) হঠাৎ সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় দেশের সব রাজনৈতিক দলের আগে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামী।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্র: জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বুকসমান পানি ভেঙে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করেন।

পুনর্বাসন কার্যক্রম: বন্যা-পরবর্তী সময়ে ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের পুনর্বাসনে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা এবং গৃহনির্মাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয় ডা. শফিকুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।

২০২৬: চট্টগ্রামের বর্তমান বন্যায় ত্রাতা রূপে 'ষাটোর্ধ্ব যুবক'

বর্তমানে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগের ধীরগতির মাঝেই বরাবরের মতো সবার আগে রাজপথে এবং বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা গেছে জামায়াত আমিরকে।

"ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি ক্লান্তিহীনভাবে সরাসরি সশরীরে চলে গেছেন ক্ষতিগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত জনগণের দুয়ারে। মানুষকে নিজে হাতে সহায়তা করছেন অর্থ, খাবার ও বস্ত্র দিয়ে। তার এই নিরলস পরিশ্রম দেখে অনেকে তাকে ‘ষাটোর্ধ্ব যুবক’ বলে আখ্যায়িত করছেন।"

রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল বা চড়াই-উতরাই যাই থাকুক না কেন, "সবার আগে বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষ"—এই নীতিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডা. শফিকুর রহমানের দূরদর্শী ও দরদী নেতৃত্ব দলটিকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে জামায়াত ও তার আমিরের এই সক্রিয় ভূমিকা তাদের দেশের অন্যতম প্রধান মানবিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 ড. মির্জা গালিবের মন্তব্যে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও জামায়াতের উদ্যোগ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব সম্প্রতি ফেসবুকে রাজনৈতিক দলের মূল কাজ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি উদ্যোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

🏛️ রাজনৈতিক দলের মূল দায়িত্ব

ড. মির্জা গালিবের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় কাজ হলো:

 * জনগণের কাছে যাওয়া: সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো।

 * জনগণের কথা শোনা: তাদের অভাব, অভিযোগ ও মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনা।

তিনি জোর দেন যে, নিজেদের দাবি-দাওয়া জানানোর জন্য যেন জনগণকে সবসময় ক্ষমতার কাছে যেতে না হয়, বরং ক্ষমতা নিজেই যেন জনতার দোর-গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়।

📜 জামায়াতের 'জনতার ইশতেহার' উদ্যোগ

ড. গালিব জামায়াতের একটি নতুন উদ্যোগের প্রশংসা করে সেটিকে 'অসাধারণ' বলে আখ্যায়িত করেছেন:

 * উদ্যোগের নাম: 'জনতার ইশতেহার' তৈরি।

 * উদ্দেশ্য: জনগণের কথা শোনার মাধ্যমে তাদের চাহিদা ও প্রায়োরিটির আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা।

 * বৈশিষ্ট্য: ইশতেহারে করা প্রতিশ্রুতিগুলো পরবর্তীতে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার জন্য একটি ফলোআপ সিস্টেম রাখা হবে।

 * প্রভাব: তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধরনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে।

✨ জনগণের আগ্রহের কারণ ও জামায়াতের করণীয়

জুলাইয়ের পর থেকে জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. গালিব বলেন:

 * মূল কারণ: জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্খা।

 * সুপারিশ: জামায়াতের উচিত হবে অন্যান্য দলের প্রতি কোনো নেগেটিভ কথা না বলে শুধু ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসলে তারা কী কী করবে সেই পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়া।

 * জনবিশ্বাস: মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ইসলামিস্টরা সততা আর যোগ্যতার সঙ্গে জাতিকে 

নেতৃত্ব দিতে পারে।

ইসলামি শাসনে অমুসলিমদের অংশগ্রহণ: কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে এক বিশ্লেষণ

ইসলামি শাসনব্যবস্থা মানেই কি কেবল মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? অমুসলিমরা কি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সক্ষম? ইতিহাস, কুরআন এবং হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এই ধারণাকে সমর্থন করে যে, ইসলাম যোগ্যতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থকে ভিত্তি করে অমুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অনুমতি দেয়, যতক্ষণ না তারা রাষ্ট্রের শত্রুতা করে বা জনকল্যাণের পরিপন্থী কাজ করে। এই নিবন্ধে আমরা ইসলামি শাসনে অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্তির ঐতিহাসিক নজির এবং এর পেছনের ধর্মীয় ভিত্তিগুলো আলোচনা করব।

১. 📜 কুরআন ও হাদীসের নীতিগত অবস্থান

ইসলাম ধর্ম তার অনুসারীদের সদাচরণ, ন্যায়বিচার এবং চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার নির্দেশ দেয়। এটিই মূলত অমুসলিমদের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের পথ উন্মোচন করেছে।

ন্যায়ের নির্দেশ ও মানবিক সম্পর্ক

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা অমুসলিমদের প্রতি ন্যায় ও সদাচরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য:

> “আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না যে, যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি ভালো মনোভাব রাখতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।”

> — সূরা মুমতাহিনা (৬০:৮)

এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, অমুসলিম যারা ইসলামের শত্রু নয়, তাদের সাথে কেবল সদাচরণই নয়, ন্যায়বিচার করাও আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় পদ ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করা এই ন্যায়েরই অংশ।

চুক্তি ও ওয়াদা রক্ষা

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একটি চুক্তির মাধ্যমে আসে। এই চুক্তি রক্ষায় ইসলাম জোর দেয়। নবী করীম (সা.) বলেন:

> “যদি কোনো অমুসলিম তোমাদের সাথে চুক্তি করে, তাহলে তাকে তার চুক্তি পূর্ণ করো।”

> — সহিহ বুখারী

এই হাদীসটি ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্বস্ততা ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অমুসলিমদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে।

সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা

অবশ্যই, কুরআন গোপনীয়তা ও কৌশলগত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশও দেয়। সূরা নিসা (৪:১৪১) এবং সূরা মায়েদা (৫:২) এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সতর্ক থাকার কথা বলে যেখানে ধর্মীয় বিরোধ বা শত্রুতা বিদ্যমান। তবে এই সতর্কতাগুলো যোগ্য ও বিশ্বস্ত অমুসলিমদের জনকল্যাণমূলক দায়িত্বে নিয়োগের বিরোধী নয়।

২. 🏛️ ইতিহাসের পাতা থেকে অন্তর্ভুক্তির নজির

ইসলামের ইতিহাসে শুরু থেকেই অমুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যা কুরআনের উদার নীতির প্রতিফলন ঘটায়।

খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে

 * হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফত: তাঁর শাসনামলে দামেস্কে খ্রিষ্টান কর্মকর্তা ইবনে মানসুর রাজস্ব বিভাগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। এছাড়াও, বহু ইহুদি চিকিৎসক সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতেন। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় উপার্জনের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও যোগ্যতা অমুসলিমদের অগ্রাধিকার দিয়েছে।

আব্বাসীয় ও মুঘল শাসনে

 * আব্বাসীয় খেলাফত (হাউস অব উইজডম): আব্বাসীয় যুগে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ আরও বিস্তৃত হয়।

   * হুনাইন ইবনে ইসহাক: এই নেস্তোরিয়ান খ্রিষ্টান পণ্ডিত ছিলেন বিখ্যাত 'হাউস অব উইজডম'-এর প্রধান অনুবাদক। তিনি গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের রচনাবলি মুসলিম বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেন।

   * বাখতিশু পরিবার: এই পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে খলিফাদের রাজচিকিৎসক ছিলেন।

   * বাগদাদের রাজস্ব দপ্তরে (দিওয়ানুল খারাজ) ইহুদি ও খ্রিষ্টান কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন।

 * মুঘল সাম্রাজ্য: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মন্ত্রিসভাতেও প্রায় ২২% সদস্য ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। এটি একটি বিশাল প্রমাণ যে, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দক্ষতা ও যোগ্যতাই ছিল নিয়োগের মূল ভিত্তি।

৩. 💡 'ইসলামি রাষ্ট্র' এবং 'মুসলিম শাসিত রাষ্ট্র'-এর পার্থক্য

ঐতিহাসিক এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে: 'ইসলামি রাষ্ট্র' ধারণা এবং 'মুসলমান দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র' একই বিষয় নয়।

 * ইসলামি রাষ্ট্র: এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা কুরআন ও সুন্নাহর নীতি, বিশেষত ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

 * মুসলিম শাসিত রাষ্ট্র: এমন এক রাষ্ট্র, যার শাসক মুসলমান।

ইসলামি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায় ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, আর এই লক্ষ্যের পথে যোগ্য অমুসলিমরা অবশ্যই সহযোগী হতে পারে। ইতিহাস স্পষ্ট করে জানায়—যোগ্যতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থকে ভিত্তি করে ইসলামি শাসনব্যবস্থায় অমুসলিমরাও দীর্ঘসময় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োজিত ছিলেন।

৪. 🌍 আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব

বর্তমানে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক অমুসলিম প্রার্থী মনোনয়ন (যেমন: খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দী) দেওয়া হচ্ছে, যা ইসলামের এই ঐতিহাসিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিরই ধারাবাহিকতা। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ইসলাম ধর্ম জনস্বার্থ ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়, ধর্মীয় বিভেদ ছাড়াই।

সারসংক্ষেপ: ইসলামি রাষ্ট্র অমুসলিমদের প্রতি কেবল সহনশীলতাই দেখায় না, বরং যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অংশগ্রহণের সুযোগও দেয়। কুরআনের ন্যায়ের আহ্বান, রাসূল (সা.)-এর চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং খলিফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে মুঘলদের আমলের ঐতিহাসিক নজিরগুলো এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিরই সাক্ষ্য বহন করে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

 * পবিত্র কুরআন, সূরা মুমতাহিনা (৬০:৮)।

 * সহিহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, হাদীস নং - ২৭৩১।

 * ঐতিহাসিক দলিলসমূহ (ইবনে মানসুর, হুনা

ইন ইবনে ইসহাক, আওরঙ্গজেবের মন্ত্রিসভা)।


জামায়াতের সাধারণ ক্ষমা ও একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত:

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দলগতভাবে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে একটি সঠিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা প্রতিশোধপরায়ণতা, ফ্যাসিবাদী মনোভাব এবং চরমপন্থা থেকে দলকে দূরে রেখেছে।

আইনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের:
প্রতিশোধ নয় আওয়ামী লীগের অপরাধীদের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক দল নিজ উদ্যোগে প্রতিপক্ষকে বিচার করতে পারে না, কারণ এটি বেআইনি এবং সন্ত্রাসবাদী আচরণের মধ্যে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী, চরমপন্থী দলগুলোই সাধারণত প্রতিপক্ষকে দলগতভাবে বিচার ও হত্যার মাধ্যমে শাস্তি দেয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী একটি গণতান্ত্রিক ইসলামী দল হওয়ায় বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করেছে। তারা দলীয় নেতাকর্মীদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে।


সাধারণ ক্ষমার কৌশলগত সফলতা:

জামায়াতের সাধারণ ক্ষমার ফলে আওয়ামী লীগের "ভিক্টিমহুড রাজনীতি" ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অপরাধী সংখ্যা এত বেশি যে, জামায়াত দলগতভাবে প্রতিশোধ নিতেও পারত না।

ধরা যাক, জামায়াত চরমপন্থার পথ বেছে নিতো—তাহলে তারা হয়তো তিন-চারশ’ পাতি লীগ কর্মীকে হত্যা করতে পারতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লীগের ফ্যাসিস্ট উচ্চপর্যায়ের দুর্বৃত্তদের সংখ্যা হাজার হাজার, যারা শহরের অভিজাত এলাকায় বসবাস করে এবং প্রচুর সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করে। তাদের কাউকেই জামায়াত প্রতিশোধের মাধ্যমে স্পর্শ করতে পারতো না। বরং পাতি নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা উল্টো আওয়ামী লীগের বড় অপরাধীদের আরও নিরাপদ করতো।

আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ এখন বিচারের মুখোমুখি অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের কিছু সহযোগী ও সুবিধাভোগীরা কখনোই দলটির ফ্যাসিবাদের বিচার চায় না। তারা বরং জামায়াতের প্রতিশোধপরায়ণতাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর ফন্দি আঁটতো। কিন্তু জামায়াত দলগত ক্ষমা ঘোষণা করে এই সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে।

এখন সরকারের ওপর দায়িত্ব পড়েছে, আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তদের বিচারের আওতায় আনার। একই সঙ্গে ভোটাধিকার হরণকারী ফ্যাসিস্ট লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নেও সরকার কোনো অজুহাত দেখাতে পারবে না।

জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ ক্ষমা রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এটি দলটিকে চরমপন্থার পথ থেকে দূরে রেখে একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একই সঙ্গে এটি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিচার প্রক্রিয়ার দরজা খুলে দিয়েছে।

জামায়াতের টাকার উৎসের আসল খবর

 * ছাত্রজনতার আন্দোলনে শহীদ, আহতদের পাশে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।


* বন্যাদূর্গতদের মাঝে প্রথমদিন থেকেই সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে দলটির নেতাকর্মীরা।

 * দেশের যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগেও তারা মানুষের পাশে পৌঁছে যায় সবার আগে।

 * এসব কর্মকান্ডে জামায়াত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে।

জামায়াতের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন:

 * অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, জামায়াতের এতো বিপুল অর্থের উৎস কী?

 * এই প্রশ্নটি আমিও করেছিলাম, এক উপজেলা আমীরের কাছে।

উপজেলা আমীরের সাথে লেখকের অভিজ্ঞতা:

 * উপজেলা আমির লেখককে একটি প্রোগ্রামে ডেকেছিলেন।

 * সেখানে সদস্যরা তাদের ব্যক্তিগত রিপোর্ট পেশ করে এবং জবাবদিহিতার মধ্যে পড়ে।




 * উপস্থিত প্রত্যেকে তাদের ব্যক্তিগত রিপোর্ট পেশ করে এবং সবাইকেই জবাবদিহিতার মধ্যে পড়তে হয়।

 * উপস্থিত সদস্যরা তাদের আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সংগঠনে জমা দেন।

 * আমির জানান, সদস্যরা তাদের আয়ের ৫% সংগঠনের ফান্ডে দেন।

 * রিক্সা চালক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই তাদের আয় অনুযায়ী টাকা দেন।

 * সংগঠনের চারটি স্তর রয়েছে: সমর্থক, কর্মী, অগ্রসর কর্মী ও সদস্য।

 * অগ্রসর কর্মী ও সদস্যরা ৫% দেওয়া বাধ্যতামূলক।

 * আয় ও ব্যয় রিসিট ভাউচারের মাধ্যমে হয় এবং নিয়মিত অডিট করা হয়।

 * উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে কেন্দ্রে টাকা পাঠানো হয়।

উপসংহার:

 * অন্যান্য দল কেন্দ্র থেকে টাকা নিলেও জামায়াত কেন্দ্রকে টাকা পাঠায়।

 * অধ্যাপক গোলাম আযমের ভাষায়, "বাংলাদেশের অন্য দলগুলো হলো ধনী লোকের গরীব পার্টি আর জামায়াতে ইসলামী হলো গরীব লোকের ধনী পার্টি।"

 * ঢাবি শিক্ষক শিশির ভট্টাচার্য

 এই পোস্ট শেয়ার করেছেন।

।সংকলিত।