সংকটে বরাবরই অগ্রভাগে ডা. শফিকুর রহমান ও জামায়াত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বারবার নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোতে দলটির সময়োচিত পদক্ষেপ এবং আমিরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০২২ সালের সিলেট বন্যা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ফেনী-কুমিল্লা এবং বর্তমান ২০২৬ সালের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভয়াবহ বন্যায় জামায়াতের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

২০২২: সিলেটের মহাসংকটে মানবিকতার অনন্য নজির

২০২২ সালে সিলেটের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় যখন চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তখন তৎকালীন সরকারের উদাসীনতা ও লোকদেখানো কার্যক্রমের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল জামায়াত।

তহবিল গঠন: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন সরকারি তহবিল থেকে মাত্র ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়ে সমালোচিত হয়েছিল, সেখানে জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে **৫ কোটি টাকার বিশাল তহবিল** গঠন করে।

সরেজমিনে আমির: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যখন হেলিকপ্টারে করে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, ঠিক তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে বন্যার্তদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে যান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। নগদ অর্থ ও পুনর্বাসন সামগ্রী নিয়ে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।

২০২৪: ফেনী-কুমিল্লা-নোয়াখালীর মহাপ্লাবনে দ্রুত সাড়া

২০২৪ সালের আগস্টে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী) হঠাৎ সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় দেশের সব রাজনৈতিক দলের আগে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামী।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্র: জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বুকসমান পানি ভেঙে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করেন।

পুনর্বাসন কার্যক্রম: বন্যা-পরবর্তী সময়ে ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের পুনর্বাসনে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা এবং গৃহনির্মাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয় ডা. শফিকুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।

২০২৬: চট্টগ্রামের বর্তমান বন্যায় ত্রাতা রূপে 'ষাটোর্ধ্ব যুবক'

বর্তমানে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগের ধীরগতির মাঝেই বরাবরের মতো সবার আগে রাজপথে এবং বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা গেছে জামায়াত আমিরকে।

"ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি ক্লান্তিহীনভাবে সরাসরি সশরীরে চলে গেছেন ক্ষতিগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত জনগণের দুয়ারে। মানুষকে নিজে হাতে সহায়তা করছেন অর্থ, খাবার ও বস্ত্র দিয়ে। তার এই নিরলস পরিশ্রম দেখে অনেকে তাকে ‘ষাটোর্ধ্ব যুবক’ বলে আখ্যায়িত করছেন।"

রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল বা চড়াই-উতরাই যাই থাকুক না কেন, "সবার আগে বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষ"—এই নীতিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডা. শফিকুর রহমানের দূরদর্শী ও দরদী নেতৃত্ব দলটিকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে জামায়াত ও তার আমিরের এই সক্রিয় ভূমিকা তাদের দেশের অন্যতম প্রধান মানবিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিস্তা প্রকল্প ও চীনা যুদ্ধবিমান আলোচনা: ঢাকার দিকে কেন ‘নিবিড় নজর’ দিল্লির?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে যেকোনো ছোটখাটো নড়াচড়াও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। আর তা যদি হয় বাংলাদেশ, চীন এবং ভারতের মতো তিন প্রতিবেশী দেশের কৌশলগত সম্পর্কের সমীকরণ, তবে তো কথাই নেই।

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

দিল্লির উদ্বেগের কেন্দ্রে যা আছে

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান যে, প্রতিবেশী অঞ্চলের যেকোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর ভারত সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখে। এই মুহূর্তে দিল্লির নজরদারির প্রধান তিনটি ক্ষেত্র হলো:

 তিস্তা মহাপরিকল্পনা: দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ভারত বেশ তৎপর।

চীনা জঙ্গি বিমান ক্রয়ের আলোচনা: প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বা জঙ্গি বিমান কেনার যে আলোচনা চলছে, তা ভারতের কৌশলগত ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজর কাড়ছে।

ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোর: চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি যৌথ অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার যে আলোচনা চলছে, তার সম্ভাব্য আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব কেমন হতে পারে, সেদিকেও চোখ রাখছে দিল্লি।

"ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলের যেকোনো উন্নয়নমূলক, অর্থনৈতিক বা কৌশলগত কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নয়াদিল্লি সব সময় যথাযথ পদক্ষেপও নিয়ে থাকে।"

রণধীর জয়সোয়াল, মুখপাত্র, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কেন এই নিবিড় পর্যবেক্ষণ?

ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, বরং অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তিস্তা নদীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্তীয় নদী প্রকল্পে চীনের মতো একটি পরাশক্তির সম্পৃক্ততা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঢাকা-বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নীতিনির্ধারকদের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পাশাপাশি, মিয়ানমারকে যুক্ত করে যে অর্থনৈতিক করিডোরের কথা বলা হচ্ছে, তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোনো বাধা সৃষ্টি না করলেও, নিজের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত যে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিক্রিয়া তারই একটি মৃদু কিন্তু স্পষ্ট ইঙ্গিত। ঢাকা এবং বেইজিংয়ের এই কূটনৈতিক ও সামরিক বোঝাপড়া আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

আপনার কি মনে হয়? বাংলাদেশের এই উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত আলোচনায় ভারতের এই নিবিড় নজরদারি কি স্বাভাবিক কৌশলগত অবস্থান, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো ভূরাজনৈতিক চাপ রয়েছে? আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট সেকশনে জানান!

মুনাফার রাজ্যে মানবিকতার বলি



নবীন ফ্যাশন ও এক ‘অদৃশ্য’ দেশপ্রেমিকের প্রস্থান

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে। মগবাজারের বিশাল সেন্টারের ‘নবীন ফ্যাশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের দেশ ছাড়ার খবরটি কেবল একজন ব্যবসায়ীর গল্প নয়; বরং এটি আমাদের সমাজ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নিদারুণ প্রতিফলন।

ঘটনার নেপথ্যে: অপরাধ যখন ‘মানবিকতা’

অভিযোগ উঠেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে পাঞ্জাবি বিক্রি করছিলেন নবীন ফ্যাশনের মালিক। যেখানে বড় বড় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ৩০০ টাকার পাঞ্জাবি ৫০০০ টাকায় বিক্রি করে পকেট ভারী করতে মরিয়া, সেখানে এই ব্যবসায়ী ‘অল্প লাভে’ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু এই মানবিকতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। অভিযোগের মূল বিষয়গুলো হলো:

 * ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ক্ষোভ: কম দামে পণ্য বিক্রি করায় অন্য মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের বিশাল অংকের লাভে টান পড়ে।

 * প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ: ‘প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু’ পরিচয় দিয়ে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হাতিরঝিল থানার পুলিশকে ব্যবহার করে দোকানটি বন্ধ করে দেন।

 * ভয়াবহ হুমকি: ব্যবসা গুটিয়ে না নিলে সন্তানদের ‘এতিম’ করে দেওয়ার মতো চরম হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

 * নিভৃতে দেশত্যাগ: সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং আইনি সহায়তার আশা না পেয়ে গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে সন্ধ্যায় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

গণমাধ্যমের নীরবতা: প্রশ্ন যখন সাংবাদিকদের দিকে

এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

১. সেলফ-সেন্সরশিপ: কেন এমন একটি মানবিক এবং চাঞ্চল্যকর খবর মিডিয়ায় গুরুত্ব পেল না? ‘প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু’ বা প্রভাবশালী কারো নাম জড়িয়ে গেলে কি কলম থমকে যায়?

২. ফ্যাসিবাদ তৈরির কারিগর: অতীতে যেভাবে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে বা ব্যক্তিবিশেষকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে ‘ফ্যাসিস্ট’ বানানো হয়েছিল, বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতা কি সেই একই পথে হাঁটছে?

> "যে দেশে ভালো কাজের পুরস্কার হয় দেশত্যাগ এবং হুমকি, সে দেশে সুস্থ ধারার ব্যবসা বা মানবিকতা টিকে থাকা অসম্ভব।"

> আমাদের সমাজ কোথায় যাচ্ছে?

একজন মানুষ যখন নিজের দেশের মানুষের জন্য সস্তায় পোশাক জোগান দিয়ে ‘অপরাধী’ হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও বাজার ব্যবস্থা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। প্রধানমন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে যখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়, তখন আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়।


মগবাজারের সেই ব্যবসায়ীর দেশ ছেড়ে যাওয়া আমাদের সম্মিলিত নৈতিক পরাজয়, সেই সাথে এটি মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত। সত্যটুকু উন্মোচন করে দোষীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।


ইসলামি শাসনে অমুসলিমদের অংশগ্রহণ: কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে এক বিশ্লেষণ

ইসলামি শাসনব্যবস্থা মানেই কি কেবল মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? অমুসলিমরা কি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সক্ষম? ইতিহাস, কুরআন এবং হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এই ধারণাকে সমর্থন করে যে, ইসলাম যোগ্যতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থকে ভিত্তি করে অমুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অনুমতি দেয়, যতক্ষণ না তারা রাষ্ট্রের শত্রুতা করে বা জনকল্যাণের পরিপন্থী কাজ করে। এই নিবন্ধে আমরা ইসলামি শাসনে অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্তির ঐতিহাসিক নজির এবং এর পেছনের ধর্মীয় ভিত্তিগুলো আলোচনা করব।

১. 📜 কুরআন ও হাদীসের নীতিগত অবস্থান

ইসলাম ধর্ম তার অনুসারীদের সদাচরণ, ন্যায়বিচার এবং চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার নির্দেশ দেয়। এটিই মূলত অমুসলিমদের রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের পথ উন্মোচন করেছে।

ন্যায়ের নির্দেশ ও মানবিক সম্পর্ক

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা অমুসলিমদের প্রতি ন্যায় ও সদাচরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য:

> “আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না যে, যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি ভালো মনোভাব রাখতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।”

> — সূরা মুমতাহিনা (৬০:৮)

এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, অমুসলিম যারা ইসলামের শত্রু নয়, তাদের সাথে কেবল সদাচরণই নয়, ন্যায়বিচার করাও আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় পদ ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করা এই ন্যায়েরই অংশ।

চুক্তি ও ওয়াদা রক্ষা

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একটি চুক্তির মাধ্যমে আসে। এই চুক্তি রক্ষায় ইসলাম জোর দেয়। নবী করীম (সা.) বলেন:

> “যদি কোনো অমুসলিম তোমাদের সাথে চুক্তি করে, তাহলে তাকে তার চুক্তি পূর্ণ করো।”

> — সহিহ বুখারী

এই হাদীসটি ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্বস্ততা ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অমুসলিমদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে।

সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা

অবশ্যই, কুরআন গোপনীয়তা ও কৌশলগত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশও দেয়। সূরা নিসা (৪:১৪১) এবং সূরা মায়েদা (৫:২) এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সতর্ক থাকার কথা বলে যেখানে ধর্মীয় বিরোধ বা শত্রুতা বিদ্যমান। তবে এই সতর্কতাগুলো যোগ্য ও বিশ্বস্ত অমুসলিমদের জনকল্যাণমূলক দায়িত্বে নিয়োগের বিরোধী নয়।

২. 🏛️ ইতিহাসের পাতা থেকে অন্তর্ভুক্তির নজির

ইসলামের ইতিহাসে শুরু থেকেই অমুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যা কুরআনের উদার নীতির প্রতিফলন ঘটায়।

খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে

 * হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফত: তাঁর শাসনামলে দামেস্কে খ্রিষ্টান কর্মকর্তা ইবনে মানসুর রাজস্ব বিভাগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। এছাড়াও, বহু ইহুদি চিকিৎসক সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতেন। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় উপার্জনের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও যোগ্যতা অমুসলিমদের অগ্রাধিকার দিয়েছে।

আব্বাসীয় ও মুঘল শাসনে

 * আব্বাসীয় খেলাফত (হাউস অব উইজডম): আব্বাসীয় যুগে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ আরও বিস্তৃত হয়।

   * হুনাইন ইবনে ইসহাক: এই নেস্তোরিয়ান খ্রিষ্টান পণ্ডিত ছিলেন বিখ্যাত 'হাউস অব উইজডম'-এর প্রধান অনুবাদক। তিনি গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের রচনাবলি মুসলিম বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেন।

   * বাখতিশু পরিবার: এই পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে খলিফাদের রাজচিকিৎসক ছিলেন।

   * বাগদাদের রাজস্ব দপ্তরে (দিওয়ানুল খারাজ) ইহুদি ও খ্রিষ্টান কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন।

 * মুঘল সাম্রাজ্য: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মন্ত্রিসভাতেও প্রায় ২২% সদস্য ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। এটি একটি বিশাল প্রমাণ যে, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দক্ষতা ও যোগ্যতাই ছিল নিয়োগের মূল ভিত্তি।

৩. 💡 'ইসলামি রাষ্ট্র' এবং 'মুসলিম শাসিত রাষ্ট্র'-এর পার্থক্য

ঐতিহাসিক এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে: 'ইসলামি রাষ্ট্র' ধারণা এবং 'মুসলমান দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র' একই বিষয় নয়।

 * ইসলামি রাষ্ট্র: এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা কুরআন ও সুন্নাহর নীতি, বিশেষত ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

 * মুসলিম শাসিত রাষ্ট্র: এমন এক রাষ্ট্র, যার শাসক মুসলমান।

ইসলামি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায় ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, আর এই লক্ষ্যের পথে যোগ্য অমুসলিমরা অবশ্যই সহযোগী হতে পারে। ইতিহাস স্পষ্ট করে জানায়—যোগ্যতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থকে ভিত্তি করে ইসলামি শাসনব্যবস্থায় অমুসলিমরাও দীর্ঘসময় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োজিত ছিলেন।

৪. 🌍 আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব

বর্তমানে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক অমুসলিম প্রার্থী মনোনয়ন (যেমন: খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দী) দেওয়া হচ্ছে, যা ইসলামের এই ঐতিহাসিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিরই ধারাবাহিকতা। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ইসলাম ধর্ম জনস্বার্থ ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়, ধর্মীয় বিভেদ ছাড়াই।

সারসংক্ষেপ: ইসলামি রাষ্ট্র অমুসলিমদের প্রতি কেবল সহনশীলতাই দেখায় না, বরং যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অংশগ্রহণের সুযোগও দেয়। কুরআনের ন্যায়ের আহ্বান, রাসূল (সা.)-এর চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং খলিফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে মুঘলদের আমলের ঐতিহাসিক নজিরগুলো এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিরই সাক্ষ্য বহন করে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

 * পবিত্র কুরআন, সূরা মুমতাহিনা (৬০:৮)।

 * সহিহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, হাদীস নং - ২৭৩১।

 * ঐতিহাসিক দলিলসমূহ (ইবনে মানসুর, হুনা

ইন ইবনে ইসহাক, আওরঙ্গজেবের মন্ত্রিসভা)।


লুৎফুজ্জামান বাবর, দশ ট্রাক অস্ত্র এবং একটি চেপে রাখা সত্য


সম্প্রতি দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের খালাস পাওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠিত ন্যারেটিভকে এই রায় এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যে, এর পেছনের রাজনীতি ও বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। যে আলাপ বছরের পর বছর ধরে চলেছে—"বাবর দশ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে আসছিলেন"—তা যদি মিথ্যাই হয়, তবে আসল সত্যটা কী?

যুক্তির কাছে কি আবেগ পরাজিত?

প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—লুৎফুজ্জামান বাবর কেন নিজের সরকারের সময়ে অবৈধভাবে অস্ত্র আনবেন? তিনি তখন রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, দেশের সকল আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা তার অধীনে। যার নিয়ন্ত্রণে পুরো দেশের বৈধ অস্ত্রের ভান্ডার, তার কেন লুকিয়ে দশ ট্রাক অস্ত্র আনার প্রয়োজন পড়বে? এই সাধারণ যুক্তি বরাবরই আওয়ামী লীগের তৈরি করা রাজনৈতিক ন্যারেটিভের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যে জোট সরকারের আমলে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের চালান আটক করা হয়েছিল, সেই সরকারকেই পরবর্তীকালে এই মামলার আসামি বানানো হয়। যারা অস্ত্র ধরলো, তারাই হয়ে গেল অপরাধী—রাজনীতির কি विचित्र খেলা!

অস্ত্রের আসল গন্তব্য কোথায় ছিল?

সত্যিকার অর্থে, এই অস্ত্রের চালান বাংলাদেশের জন্য ছিল না। এটি ছিল ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা (ULFA)-এর জন্য। বাংলাদেশকে নিছক একটি রুট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এই গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্রগুলো পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।

তৎকালীন সরকারের একটি অংশ হয়তো চেয়েছিল, চালানটি নিরাপদে উলফার হাতে পৌঁছাক। geopolitics বা ভূ-রাজনীতির বিবেচনায় অনেকেই মনে করেন, ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে উলফার মতো শক্তিকে সহায়তা করা ছিল একটি যৌক্তিক কৌশল। যেকোনো স্বাধীন দেশেরই উচিত প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তবে, প্রশাসনের অন্য কোনো অংশের হস্তক্ষেপে চালানটি ধরা পড়ে যায়, যা জোট সরকারের জন্যই একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।

পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার এই ঘটনাকে পুঁজি করে একটি রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করে, যেখানে বিএনপি-জামায়াত জোটকে সরাসরি "জঙ্গিবাদী" ও "রাষ্ট্রদ্রোহী" হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। দুঃখজনকভাবে, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বক্তা আজও সেই একই ন্যারেটিভ অনুসরণ করে চলেছেন, যা সত্যকে আড়াল করে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা মাত্র।

বাবর: একটি নাম, একটি প্রতীক

লুৎফুজ্জামান বাবর আজ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তিনি সেই শক্তির প্রতীক, যা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এত বছরের রাজনৈতিক প্রচারণা প্রমাণ করে যে, তিনি দিল্লির জন্য একটি বড় আতঙ্কের নাম ছিলেন। বাবর প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেম এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিলে যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।

বাবর হওয়া সহজ নয়। এর জন্য যে সাহস, দূরদর্শিতা এবং দেশপ্রেম প্রয়োজন, তা সবার থাকে না। তার মুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি নয়, এটি একটি চেপে রাখা সত্যের মুক্তি।


বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের সমর্থনে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব জাগরণ!



আমার জানামতে, বাংলাদেশ আজ এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্বব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই মুসলিম দেশটি যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছে, তা সত্যিই নজিরবিহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক কেন্দ্র পর্যন্ত, আজ যেন গোটা বাংলাদেশ থমকে দাঁড়িয়েছে মুসলিম বিশ্বের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে।

ছবিতে আপনারা যে ব্যক্তিকে দেখছেন, Zahid Akhtar, যিনি নিজেকে Founder of DOAM হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, তিনিও সম্ভবত এই বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টের সূত্র ধরে আমরা জানতে পারছি, পণ্ডিত, শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং এমনকি শিশুরাও আজ এই দেশব্যাপী বিক্ষোভে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে।

এই দৃশ্য আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, আমাদের বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের যেকোনো প্রয়োজনে সবসময়ই সামনের সারিতে থাকেন। তাদের এই ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর এবং সংহতি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

আসুন, আমরাও তাদের এই চেতনাকে সম্মান জানাই এবং বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মুসলিমদের জন্য সর্বদা সোচ্চার থাকি। বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব জাগরণ প্রমাণ করে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Zahid Akhtar (@ZahidDOAM) ইংল্যান্ড, যুক্তরাজ্য থেকে এই বার্তাটি শেয়ার করেছেন এবং তিনি DOAM (সম্ভবত Defence of Authentic Muslim thought)-এর প্রতিষ্ঠাতা। জানুয়ারী ২০১৫ থেকে তিনি টুইটারে সক্রিয় রয়েছেন এবং তার ১৯ হাজারেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে।